রণাঙ্গন থেকে মানবতার সেবায়: সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবগাথা

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন বহু সংকটময় প্রতীক হিসেবে দেশের সশস্ত্র বাহিনী জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীনতার রণাঙ্গন থেকে শুরু করে সীমান্ত নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জাতীয় সংকট, নির্বাচনকালীন সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা এবং দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ফলে সশস্ত্র বাহিনী শুধু দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়; বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও মানবিক সহায়তার অন্যতম নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। চলতি বছরের বর্ষায়ও সেই চিত্রের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। 

টানা ভারী বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং সমুদ্রের অস্বাভাবিক জোয়ারের কারণে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হলে হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে যায় এবং খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট দেখা দেয় । এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনী দ্রুত উদ্ধার অভিযান, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ, চিকিৎসাসেবা এবং জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিয়ে আবারও প্রমাণ করেছে যে, দেশের সশস্ত্র বাহিনী শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের নয়, মানবতারও এক নির্ভরযোগ্য রক্ষাকবচ।

বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর এই মানবিক ভূমিকার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহ্য, আত্মত্যাগ ও পেশাদারিত্বের ইতিহাস। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি ও উন্নয়নে অবদান, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন এবং আধুনিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রতিটি অধ্যায় বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবময় অভিযাত্রার সাক্ষ্য বহন করে। তাই চলমান বন্যায় তাদের মানবিক ভূমিকার আলোকে এই গৌরবগাথা নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে।

চলতি বর্ষায় অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢল এবং জোয়ারের প্রভাবে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালী, বোয়ালখালী, হাটহাজারী ও ফটিকছড়িসহ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। বিশেষ করে লোহাগাড়া, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীতে প্রায় ১ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিস্থিতির অবনতি হলে জেলা প্রশাসনের অনুরোধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১০ ও ২৪ পদাতিক ডিভিশন দ্রুত উদ্ধার, অনুসন্ধান ও ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করে। নৌযানের সাহায্যে আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তর, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণ এবং দুর্গত এলাকায় অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপনের মাধ্যমে সেনাবাহিনী সমন্বিতভাবে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করে।

বাংলাদেশ নৌবাহিনীও চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, বিজয় নগর, আকমল আলী রোড, নিউ মুরিং মাদ্রাসা, নারিকেল তলা ও নেভি হাসপাতাল গেট এলাকায় পানিবন্দি মানুষের মধ্যে প্রায় ২ হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করে এবং বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ করে । ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে না আসা পর্যন্ত এই মানবিক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয় নৌবাহিনী।
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবগাথার সূচনা মূলত ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে।

পাকিস্তানি সামরিক জান্তার গণহত্যা ও দমন- পীড়নের বিরুদ্ধে তৎকালীন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, পুলিশ, আনসার এবং সর্বস্তরের মুক্তিযোদ্ধারা সম্মিলিতভাবে স্বাধীনতার সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। নিয়মিত বাহিনী, গেরিলা যোদ্ধা ও নৌ-কমান্ডোদের সমন্বিত অভিযানে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে এবং ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় অর্জন করে । মুক্তিযুদ্ধে বীরশ্রেষ্ঠ, বীর-উত্তম, বীরবিক্রম ও বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত অসংখ্য বীর সেনানীর আত্মত্যাগ আজও বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর মূল্যবোধ, পেশাদারিত্ব ও দেশপ্রেমের ভিত্তি হিসেবে অনুপ্রেরণা জোগায়।

স্বাধীনতার পর দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষাই সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব হয়ে ওঠে । সীমান্ত, আকাশসীমা ও সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবর্তিত আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা-বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাহিনীকে ধারাবাহিকভাবে আধুনিকায়ন করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং জলবায়ুগত বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রায় প্রতি বছরই ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, নদীভাঙন ও পাহাড়ধসের মতো দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয়। এই বাস্তবতায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী একটি কার্যকর ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত সক্ষমতা গড়ে তুলেছে। সিডর, আইলা, মহাসেন, রোয়ানু, আম্পান, সিত্ৰাং, মোখা ও রেমালের মতো বড় দুর্যোগে উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ, আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনা, চিকিৎসাসেবা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনরুদ্ধারে বাহিনীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও কোয়ারেন্টিন, চিকিৎসা সহায়তা, জরুরি সরঞ্জাম পরিবহন ও টিকাদান কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তারা জাতীয় সংকট মোকাবিলায় অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দেয়। 

সাম্প্রতিক চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের বন্যায় পরিচালিত উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম সেই ধারাবাহিকতারই সর্বশেষ উদাহরণ, যা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী শুধু দেশের নিরাপত্তার প্রহরী নয়, দুর্যোগের সময় জনগণের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়ও।

সংবিধান ও প্রচলিত আইনের আলোকে বিশেষ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় বিভিন্ন জাতীয়
দায়িত্ব পালন করে থাকে। জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকালে তারা নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী বেসামরিক প্রশাসনের অধীনে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সহিংসতা প্রতিরোধ এবং ভোটারদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়তা করে । একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনা, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, রাষ্ট্রপ্রধানদের সফর এবং অন্যান্য জাতীয় আয়োজনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও বাহিনীর পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯৮৮ সালে প্রথম অংশগ্রহণের পর থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ শান্তিরক্ষী দেশগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছে। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ, বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা এবং সংঘাত-পরবর্তী পুনর্গঠন কার্যক্রমে দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন । নারী শান্তিরক্ষীদের সফল অংশগ্রহণও বাংলাদেশকে বিশেষ স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। বহু বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী দায়িত্ব পালনকালে আত্মত্যাগ করেছেন, যা বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অঙ্গীকারের উজ্জ্বল নিদর্শন।

পরিবর্তিত বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিবেশে বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীও ধারাবাহিকভাবে আধুনিকায়নের পথে এগিয়ে চলেছে। সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার মতো নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় 'ফোর্সেস গোল ২০৩০'-এর আওতায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজন, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং সমন্বিত প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নৌবাহিনীর সামুদ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিমান বাহিনীর রাডার ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং সেনাবাহিনীর আধুনিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি সংযোজন দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি বিনিময় এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প বিকাশের উদ্যোগ দীর্ঘ মেয়াদে আরো আত্মনির্ভরশীল প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। তবে আধুনিকায়নের প্রকৃত সাফল্য কেবল উন্নত অস্ত্র অর্জনে নয়; দক্ষ মানবসম্পদ, গবেষণা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন সুশাসন এবং জনগণের আস্থা অর্জনের মধ্যেই নিহিত।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক ভূরাজনীতি, ইন্দো- প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিবর্তিত বাস্তবতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব জাতীয় নিরাপত্তাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে । বন্যা, ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাস ও অন্যান্য দুর্যোগ মোকাবিলার পাশাপাশি ভবিষ্যতের সাইবার যুদ্ধ, তথ্যযুদ্ধ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও সর্বদা প্রস্তুত সশস্ত্র বাহিনী আজ জাতীয় প্রয়োজন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা, বিনিয়োগের নিরাপত্তা এবং জাতীয় স্থিতিশীলতা রক্ষার ক্ষেত্রেও একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অপরিহার্য।

স্বাধীনতার ৫৫ বছরের অভিযাত্রায় বাংলাদেশের সামনে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ যেমন এসেছে, তেমনি উন্মোচিত হয়েছে নতুন সম্ভাবনার দিগন্তও। এই সম্ভাবনাকে নিরাপদ, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতে রূপ দিতে হলে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর, পেশাদার, আত্মনির্ভর এবং সর্বোপরি জনগণমুখী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার বিকল্প নেই। কারণ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যে বাহিনী মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে জাতিকে বিজয় এনে দিয়েছে, যে বাহিনী দুর্যোগে মানুষের জীবন বাঁচাতে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে এবং যে বাহিনী বিশ্বশান্তির বার্তাবাহক হিসেবে বাংলাদেশের পতাকাকে সম্মানের সঙ্গে বহন করছে, সেই বাহিনীই আগামী দিনের নিরাপদ, আত্মমর্যাদাশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট