রাঙ্গামাটিতে গত দু’দিন টানা ভারী বৃষ্টিপাত না হওয়ায় ধীরে ধীরে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। বেশকিছু এলাকায় নামতে শুরু করেছে বন্যার পানি। এসব এলাকায় পানি নামতেই বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র।
সোমবার (১৩ জুলাই) সকাল থেকে বাঘাইছড়ি, উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ও বিলাইছড়ির ফারুয়া বাজারের পানি নামতে শুরু করায় ভেসে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির বাস্তব চিত্র। গত কয়েক দিনের টানা ভারি বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ কমলেও দুর্ভোগের শেষ নেই অসংখ্য দুর্গত মানুষের।
প্লাবিত এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু হলেও পরিস্থিতি এখনো নাজুক। তাছাড়া বরকল উপজেলার ভুষনছড়া ও বড় হরিনা এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে বলে জানা গেছে। ভারী বৃষ্টিপাত না থাকলেও ভারতের মিজোরাম থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বাঘাইছড়ি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেক বাসিন্দা আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বাড়ি ফিরতে শুরু করলেও এখনও স্বাভাবিক হয়নি জনজীবন। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও শিশুখাদ্যের তীব্র সংকটে দিন কাটছে বানভাসি মানুষের। অনেক স্থানে এখনও সরকারি ত্রাণ পৌঁছায়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। পাশাপাশি বাঘাইছড়ির সঙ্গে খাগড়াছড়ি সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে স্থানীয় বাজারে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
এদিকে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও নতুন করে কিছু এলাকা প্লাবিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। জেলার বরকল উপজেলার ঠেগা, খুব্বাং, চুমাচুমি এবং লংগদু ও রাজস্থলী উপজেলার বেশ কিছু গ্রামে কয়েক শত পরিবার নতুন করে পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন।
বরকল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজীব দাশ পুরকায়স্থ দৈনিক ইত্তেফাক ডিজিটালকে বলেন, ‘ভারী বর্ষণের ফলে এই উপজেলার ৫টি ইউনিয়নে বন্যা দেখা দিয়েছে। আমাদের আশ্রয়কেন্দ্রে শনিবার থেকে লোক বাড়ছে। আজ ৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে ২২৪ জন মানুষ আছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভূষণছড়া ও বড় হরিণা ইউনিয়ন বন্যায় বেশি প্লাবিত হয়েছে। নতুন করে শুভলং ইউনিয়নও প্লাবিত হতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে উপজেলায় প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দী রয়েছেন। আমাদের ত্রাণ কার্যক্রম চলমান। তবে দুর্গম এলাকাগুলোতে পানির তীব্র স্রোতের কারণে ত্রাণ পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে| আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন জানিয়েছে আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা মানুষের মধ্যে নিয়মিত তিনবেলা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। এছাড়াও পুরো জেলার বিভিন্নস্থানে এ পর্যন্ত ১৩১টি পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে বলে নিশ্চিত করেছে জেলা প্রশাসন।
অন্যদিকে বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়ন থেকে পানি সম্পূর্ণ নেমে গেছে। পানি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে দৃশ্যমান হচ্ছে ক্ষতচিহ্ন। বেশ কিছু বাড়িঘর সম্পূর্ণভাবে বিধ্বস্ত হওয়ায় অনেকে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। পানি কমে আসায় বর্তমানে সড়ক ও ঘরবাড়ির কাদামাটি, ময়লা পরিষ্কারের কাজ করছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। তবে ফারুয়া বাজারের দোকানপাটে দুই থেকে আড়াই ফুট পর্যন্ত কাঁদামাটির স্তূপ দেখা গেছে।
ফারুয়া বাজার কমিটির সভাপতি মো. হারুন বলেন,
বন্যায় বাজার ও আশপাশের এলাকার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পুরো বাজার ও আশপাশের এলাকা দুই থেকে আড়াই ফুট পলিমাটির নিচে নিমজ্জিত হয়ে আছে। পলি অপসারণ করে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এখনও নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।
এর আগে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত রাঙ্গামাটির ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে জানান, গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, বিদ্যুৎ, কৃষি, মৎস্যসহ যাবতীয় ক্ষতি পুষিয়ে দিয়ে পুনর্বাসনের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হবে। রাঙ্গামাটিসহ পার্বত্য এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ প্রধানমন্ত্রী নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।
সাবেক পার্বত্যমন্ত্রী রাঙ্গামাটির সদস্য দীপেন দেওয়ান জেলার প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলা পরিদর্শন করে দুর্গতদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী,খাবার বিতরণ করছেন। গত রোববার তিনি বাঘাইছড়ি উপজেলার বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন এবং আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থানরতদের খোজ খবর নেন।
এছাড়া রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসন,রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদসহ দুর্গম এলাকাগুলোতে স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দিতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে সেনাবাহিনী ও বিজিবি।