প্রবল হচ্ছে এল নিনো

বাংলাদেশসহ ছয় দেশে বন্যা, ভূমিধস ও রোগের আশঙ্কা

দ্রুত শক্তিশালী হতে থাকা এল নিনো আবহাওয়া পরিস্থিতি পূর্ব আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য ভয়াবহ বন্যা, রোগব্যাধি এবং খরার হুমকি তৈরি করছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি)। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

সোমবার (১৩ জুলাই) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, কেনিয়া, উগান্ডা, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের লাখো মানুষ এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে চলতি মৌসুমি বৃষ্টিতেই প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে।

আইআরসির জরুরি পরিস্থিতি-বিষয়ক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বব কিচেন বলেন, ‘আমরা একসঙ্গে কয়েকটি জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হতে দেখছি। যেসব এলাকার আরেকটি ধাক্কা সামলানোর মতো ন্যূনতম সক্ষমতা নেই, মূলত তারাই এখন নিশানা বা বিপদের মুখে রয়েছে।’

সংস্থাটির মতে, এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় আবহাওয়ার বৈরিতা আরও বাড়তে পারে। এ কারণে বাংলাদেশে ভারী বৃষ্টি, বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি অব্যাহত থাকার পাশাপাশি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।

এদিকে গত  ৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার জানায়, এল নিনো দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে। ১৯৫০ সালের পর থেকে এটি অন্যতম শক্তিশালী রূপ নেওয়ার ৮১ শতাংশ সম্ভাবনা রয়েছে। এর প্রভাব মূলত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। 

এর আগে, জুলাইয়ের শুরুতে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছিল, এল নিনো পরিস্থিতি ইতোমধ্যেই সৃষ্টি হয়েছে এবং জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এটি আরও দ্রুত শক্তিশালী হতে পারে।

পূর্ব আফ্রিকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে আইআরসি। সংস্থাটির তথ্যমতে, সোমালিয়ার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে গড়ের চেয়ে বেশি বৃষ্টির-৬০ শতাংশ-সম্ভাবনা রয়েছে। দীর্ঘদিনের খরা ও বাস্তুচ্যুতির সংকটে দেশটিতে বর্তমানে ৪৮ লাখ মানুষের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। এল নিনোজনিত বন্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

আইআরসি স্মরণ করিয়ে দেয়, ২০২৩ সালের বন্যায় সোমালিয়ায় প্রায় ১৩ হাজার টন ফসল নষ্ট হয়েছিল এবং বহু শহর ও জনপদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবার একই ধরনের বন্যা হলে ক্ষয়ক্ষতি আরও বেশি হতে পারে। কারণ, মানুষ ইতিমধ্যে খরা ও আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ার কারণে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাবে আক্রান্ত অঞ্চলগুলোর জনগণ ইতিমধ্যেই খরা, সংঘাত এবং আন্তর্জাতিক ত্রাণ বাজেট কমে যাওয়ার কারণে চরম চাপে রয়েছে। ফলে নতুন একটি জলবায়ুগত বিপর্যয় মোকাবিলার সক্ষমতা তাদের খুবই সীমিত।

এল নিনো হলো- প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রার একটি স্বাভাবিক পরিবর্তন, যা সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর অন্তর ঘটে। স্বাভাবিক অবস্থায় বাণিজ্যিক বায়ু উষ্ণ পানিকে পশ্চিম দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু এই বায়ু দুর্বল হয়ে পড়লে উষ্ণ পানি পুরো প্রশান্ত মহাসাগরে ছড়িয়ে পড়ে এবং বৈশ্বিক আবহাওয়ার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এর ফলে বিশ্বের কোনো অঞ্চলে অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিপাত হয়, আবার কোথাও বৃষ্টিপাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। পূর্ব আফ্রিকায় এর অর্থ হলো বছরের মাঝামাঝি সময়ে শুষ্ক আবহাওয়া এবং পরে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে অতিরিক্ত আর্দ্র ও বৃষ্টিপূর্ণ আবহাওয়া। আবহাওয়াবিদদের মতে, ভারত মহাসাগরের তাপমাত্রার আরেকটি সম্পর্কিত পরিবর্তনের কারণে চলতি বছর এল নিনোর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে।

এল নিনোর প্রভাব আরও জোরালো হওয়ার প্রেক্ষাপটে আইআরসি দাতা সংস্থা ও বিভিন্ন সরকারের প্রতি পূর্ব আফ্রিকা ও এশিয়ায় আগাম দুর্যোগ প্রস্তুতি কার্যক্রমে এখনই আরও অর্থায়নের আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, দুর্যোগ আঘাত হানার আগে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে নগদ সহায়তা, বিশুদ্ধ পানি ও আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া গেলে প্রাণহানি, সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি এবং মানুষের দুর্ভোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।

বাংলাদেশে কেন এত বৃষ্টি

৫ জুলাই থেকে বাংলাদেশে ব্যাপক বৃষ্টি শুরু হয়। আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্র জানায়, মাসের ১১ দিনে মোট বৃষ্টির ৭৫ শতাংশ হয়ে গেছে।

আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, এবার নিম্নচাপের পাশাপাশি এত বৃষ্টির আরেকটি কারণ ছিল মৌসুমি বায়ুর সক্রিয় অবস্থান। মৌসুমি বায়ু এবার স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত সাত দিন পরে এসেছে। জুন মাসে কম বৃষ্টি হলেও জুলাইয়ের প্রথম দিকেই মৌসুমি বায়ু সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাতেই এ বৃষ্টি হয়।

আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ গত এক সপ্তাহের বেশি বৃষ্টির আরও দুটি কারণ তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, প্রথম কারণ হলো সাগরে সৃষ্টি হওয়া নিম্নচাপের ভিন্ন গতি। তিনি বলেন, এবার নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছিল উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে। স্বাভাবিকভাবে এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা ও বরিশাল হয়ে মধ্যাঞ্চলের ঢাকা বিভাগ পার হয়ে চলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এবার জলীয় বাষ্পপূর্ণ এ বাতাস দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল বা চট্টগ্রাম বিভাগমুখী হয়েছে। এ কারণে ওই অঞ্চলে অপেক্ষাকৃত বেশি বৃষ্টি হয়েছে।

চলতি বছরের গ্রীষ্ম অনেক বেশি উষ্ণ হতে পারে বলে সতর্কতা করেছিল বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)। এর কারণ হলো এল নিনোর প্রভাব। প্রশান্ত মহাসাগরীয় এই বায়ুপ্রবাহের আধিক্য দেখা দিলে উষ্ণতা বাড়ে। দেখা গেছে, পুরো ইউরোপে এবার স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক গরম পড়েছে। উত্তর আমেরিকার অনেক দেশেও এ অবস্থা।

বজলুর রশীদ বলছিলেন, এল নিনোর আরেকটি বিপরীতমুখী প্রবণতা হলো অল্প সময়ে অধিক বৃষ্টি। তাতে সাময়িক প্রশমন ঘটে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে তাপমাত্রা বেড়ে যায়। এবার যে বৃষ্টি, তা এল নিনোর বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া বলা যেতে পারে।

এবারের বৃষ্টিতে দেশে এক লাখ হেক্টরের বেশি জমি প্লাবিত হয়েছে বলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে।

বিশ্বব্যাংক সতর্ক করেছে, এল নিনো পুরোপুরি বিকশিত হলে দক্ষিণ এশিয়া এবং পূর্ব আফ্রিকার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ধানের ফলন এক-পঞ্চমাংশ থেকে অর্ধেক পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এসব অঞ্চলে ধান লাখ লাখ মানুষের খাদ্যনিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি। ফলে খাদ্যের ঘাটতি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে।

বিশ্বব্যাংক আরও ইঙ্গিত দিয়েছে, এমন একসময়ে এই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে যখন ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং তেহরানের পাল্টা হামলার কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও সার সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে চলতি বছরে সার উৎপাদনের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে, যা কৃষি উৎপাদনের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।