হরমুজ প্রণালির পর এবার লোহিত সাগরের কৌশলগত জলপথ ‘বাব আল-মান্দেব প্রণালি’ বন্ধ করে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। বিশ্লেষকদের ধারণা, ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ওপর পাল্টা প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে তেহরান।
মঙ্গলবার ( ১৪ জুলাই) রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। সমুদ্রপথে পরিবাহিত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পৌঁছে। অন্যদিকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির খবরে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের হুতি আন্দোলন আনসারুল্লাহর রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-ফারাহ সতর্ক করে বলেছেন, সৌদি আরব যদি ইয়েমেনে সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখে, তাহলে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। তার দাবি, এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক ফাওয়াজ গেরগেসের মতে, এই বার্তার মাধ্যমে ইরান বোঝাতে চাইছে যে, প্রয়োজন হলে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব—উভয় কৌশলগত জলপথেই তারা চাপ সৃষ্টি করার সক্ষমতা রাখে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আঞ্চলিক সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় সংকটে পরিণত হতে পারে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এখনই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের সম্ভাবনা না থাকলেও ধাপে ধাপে সংঘাত বিস্তারের ঝুঁকি বাড়ছে। উভয় পক্ষ সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে পাল্টাপাল্টি চাপ সৃষ্টি অব্যাহত রাখলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। একই সঙ্গে এই উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন ও তেহরানকে আবারও আলোচনায় ফিরতে বাধ্য করতে পারে বলেও তাদের ধারণা।
২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হুতি গোষ্ঠী লোহিত সাগরে ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা বিভিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে আসছে। এর ফলে অনেক আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি নিরাপত্তার কারণে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে বিকল্প পথে চলাচল শুরু করে, যা পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য হুতিদের অবস্থানে বিমান হামলা চালায় এবং ওই অঞ্চলে নৌ নিরাপত্তা জোরদারে আন্তর্জাতিক জোট গঠন করে।
কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, হরমুজের পাশাপাশি বাব আল-মান্দেবও ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত চাপ প্রয়োগের মাধ্যম। তবে তিনি মনে করেন, সর্বাত্মক সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠলেই কেবল তেহরান এ ধরনের পদক্ষেপে সম্মতি দিতে পারে।
এদিকে সৌদি আরবভিত্তিক গালফ রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান আবদুলআজিজ সাগের বলেছেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ ক্রমেই সীমিত হয়ে আসছে। তবে তার মতে, তেহরানের প্রত্যক্ষ সম্মতি ছাড়া হুতি গোষ্ঠী বড় ধরনের উত্তেজনাপূর্ণ পদক্ষেপ নেবে না। আর আন্তর্জাতিক নৌপথে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটানো হলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আরও কঠোর সামরিক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হতে পারে হুতিদের।