ময়মনসিংহে দলিল লেখক আবু জাকারিয়া মিন্টু হত্যা মামলায় ফরিদ খলিফা ও মাসুদ মিয়া নামে দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে এ মামলায় আরও ১০ আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) দুপুরে ময়মনসিংহের বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ফারহানা ফেরদৌস এ রায় দেন।
পাবলিক প্রসিকিউটর আকরাম হোসেন জানান, জমিসংক্রান্ত বিরোধের জেরে ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট ভালুকা সাবরেজিস্টার অফিসের দলিল লেখক মিন্টুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় পরদিন নিহতের স্ত্রী লতিফা খাতুন বাদী হয়ে ভালুকা থানায় ১৬ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ১৩ বছর পর এ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী ও নিহতের স্বজনরা। একই সঙ্গে দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানান তারা।
মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামিরা হলেন মো. ফরিদ খলিফা (৪৮) ও পলাতক মো. মাসুদ মিয়া (৪১)। এর মধ্যে মাসুদ মিয়া মামলার এজাহারভুক্ত ১ নম্বর এবং ফরিদ খলিফা ৫ নম্বর আসামি। রায় ঘোষণার সময় ফরিদ খলিফা আদালতে উপস্থিত থাকলেও মাসুদ মিয়া পলাতক ছিলেন।
আদালত তাদের প্রত্যেককে ৩০ হাজার টাকা জরিমানাও করেন।
যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রাপ্ত আসামিরা হলেন আবদুল মতিন (৪৫), তার বাবা আব্দুস ছাত্তার ওরফে ছন্দেন আলী (৬৮), মো. মোশারফ হোসেন (৫৮), মো. মোফাজ্জল হোসেন (৫৮), তার ভাই মো. তোফাজ্জল হোসেন (৪৮), মো. নজরুল মিয়া (৪৩), মো. মোকলেছুর রহমান (৫৩), মো. শাহজাহান আকন্দ (৪৮), তার ভাই মো. আতিকুল (৩৯) এবং পলাতক মো. সিদ্দিক মিয়া (৬৩)। আদালত তাদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। জরিমানা অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
আদালতের নথি সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে জমিজমা-সংক্রান্ত পূর্ববিরোধের জেরে ভালুকা উপজেলার উথুরা ইউনিয়নের নারাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা ও ভালুকা সাবরেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক আবু জাকারিয়া (মিন্টু) খুন হন। সেদিন তিনি পৈত্রিক সম্পত্তি দেখভাল করতে গেলে প্রতিপক্ষের লোকজন দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করেন। পরে তাকে ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী লতিফা খাতুন বাদী হয়ে ২০১৩ সালের ১৫ আগস্ট ভালুকা মডেল থানায় ১৬ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে পুলিশ ২০১৫ সালের ১৩ অক্টোবর ১২ আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। বিচার চলাকালে আদালত ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। বিচারিক কার্যক্রম শেষে বুধবার এ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ের সময় ১২ আসামির মধ্যে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত একজন এবং যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত একজন পলাতক ছিলেন।
মামলায় বাদীপক্ষে শুরু থেকে আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রাশেদা তাহমিনা। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন বিশেষ দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. আকরাম হোসেন এবং আসামিপক্ষে আইনজীবী ছিলেন এ এইচ এম খালেকুজ্জামান। তবে রায় ঘোষণার সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।
রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মো. আকরাম হোসেন সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে দলিল লেখককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। আদালত ১৮ জনের সাক্ষ্য, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে দুই আসামিকে মৃত্যুদন্ড এবং ১০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। আশা করি দ্রুত এ রায় কার্যকর হবে।
তিনি আরও বলেন, আদালত রায়ের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছেন, সাক্ষ্যপ্রমাণে হত্যাকাণ্ড সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
রায় ঘোষণার সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন নিহতের স্ত্রী লতিফা খাতুন ও ছেলে জাহিদ হাসান তালুকদার। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে জাহিদ হাসান তালুকদার বলেন, আসামিরা পরিকল্পিতভাবে আমার আব্বুকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। দীর্ঘ ১৩ বছর পর আজ মামলার রায় হলো। আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি। যাদের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, সেই রায় দ্রুত কার্যকর হোক।
অন্যদিকে রায়ের পর অসন্তোষ প্রকাশ করেন আসামিপক্ষের স্বজনরা। যাবজ্জীবনপ্রাপ্ত আসামি আতিকুলের বড় ভাই সিরাজুল ইসলাম বলেন, জমি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ঘটনাটি ঘটেছে। আমরা এ রায়ে সন্তুষ্ট নই এবং এ রায় মেনে নিতে পারছি না। আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব।
ময়মনসিংহ আদালত পরিদর্শক পি এস এম মোস্তাছিনুর রহমান বলেন, প্রায় ১৩ বছর পর একটি হত্যা মামলায় আদালত দুই আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন। ১০ আসামির উপস্থিতিতে রায় ঘোষণা করা হয়। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।