বিমানবন্দর, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, কফিশপ কিংবা শপিং মলে ফ্রি ওয়াই-ফাই ব্যবহার এখন অনেকের দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। মোবাইল ডেটা সাশ্রয়ের জন্য অনেকেই মুহূর্তেই এসব নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-মেইল, অনলাইন কেনাকাটা কিংবা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজও সেরে ফেলেন। তবে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সুবিধার আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে বড় ধরনের সাইবার ঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সব উন্মুক্ত ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক সমান নিরাপদ নয়। দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থা, ভুয়া নেটওয়ার্ক কিংবা ব্যবহারকারীর অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে সাইবার অপরাধীরা ব্যক্তিগত তথ্য, গোপন সংকেত, এমনকি আর্থিক তথ্যও হাতিয়ে নিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে তথ্য চুরি হওয়ার সময় ব্যবহারকারী কোনো সতর্কবার্তাও পান না।
কেন ঝুঁকি বেশি?
উন্মুক্ত ওয়াই-ফাই এমন একটি ইন্টারনেট ব্যবস্থা, যেখানে একই সময়ে অনেক ব্যবহারকারী সংযুক্ত থাকেন। বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, হোটেল, রেস্তোরাঁ ও কফিশপে এ ধরনের নেটওয়ার্ক বেশি দেখা যায়।
একই নেটওয়ার্কে বহু ব্যবহারকারী থাকায় তথ্য আদান-প্রদানের নিরাপত্তা তুলনামূলকভাবে দুর্বল হতে পারে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সাইবার অপরাধীরা বিভিন্ন কৌশলে তথ্য আদান-প্রদানের ওপর নজরদারির চেষ্টা করতে পারে। এতে ব্যবহারকারীর লগইন তথ্য, ই-মেইল বা অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
সবচেয়ে বড় ভুল
অনেকেই ফ্রি ওয়াই-ফাই ব্যবহার করেই মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, অনলাইন কেনাকাটা, কার্ডের লেনদেন কিংবা অফিসের গুরুত্বপূর্ণ নথি আদান-প্রদান করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অভ্যাস। আর্থিক লেনদেন বা সংবেদনশীল তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত মোবাইল ডেটা বা নিজস্ব নিরাপদ ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবহার করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
ভুয়া নেটওয়ার্কও হতে পারে ফাঁদ
সাইবার অপরাধীরা অনেক সময় জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান বা স্থানের নাম ব্যবহার করে ভুয়া ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক তৈরি করে। ব্যবহারকারী সেটিতে যুক্ত হলেই তার ব্যক্তিগত তথ্য বা লগইন তথ্য চুরির চেষ্টা করা হতে পারে।
এ কারণে কোনো প্রতিষ্ঠান বা রেস্তোরাঁর ওয়াই-ফাই ব্যবহারের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নেটওয়ার্কের সঠিক নাম নিশ্চিত করে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
নিরাপদ থাকতে যা করবেন
- উন্মুক্ত ওয়াই-ফাই ব্যবহার করে ব্যাংকিং বা আর্থিক লেনদেন থেকে বিরত থাকুন।
- গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত বা অফিসের নথি আদান-প্রদান করবেন না।
- ওয়েবসাইটের ঠিকানা ভালোভাবে যাচাই করুন।
- ফোনের স্বয়ংক্রিয় ওয়াই-ফাই সংযোগ সুবিধা বন্ধ রাখুন।
- প্রতিটি অ্যাকাউন্টে আলাদা ও শক্তিশালী গোপন সংকেত ব্যবহার করুন।
- দুই ধাপের নিরাপত্তা যাচাই চালু রাখুন।
- প্রয়োজনে বিশ্বস্ত নিরাপদ সংযোগব্যবস্থা ব্যবহার করুন।
- কাজ শেষ হলে ওয়াই-ফাই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করুন এবং নেটওয়ার্কটি সংরক্ষিত তালিকা থেকে মুছে দিন।
- মোবাইল, কম্পিউটার ও প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার নিয়মিত হালনাগাদ রাখুন।
- অপ্রয়োজনীয়ভাবে কোনো অ্যাপকে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের অনুমতি দেবেন না।
সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা
প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সাইবার অপরাধের কৌশলও বদলাচ্ছে। তাই শুধু নিরাপত্তা সফটওয়্যারের ওপর নির্ভর না করে ব্যবহারকারীকেও সতর্ক থাকতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিচিত নেটওয়ার্ক ব্যবহারের আগে যাচাই করা, সন্দেহজনক লিংকে প্রবেশ না করা এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময় নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহার করার মতো সাধারণ অভ্যাসই বড় ধরনের সাইবার ঝুঁকি এড়াতে সাহায্য করে।
বর্তমানে ব্যাংকিং, শিক্ষা, চিকিৎসা, সরকারি সেবাসহ জীবনের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ কাজই অনলাইনে সম্পন্ন হচ্ছে। ফলে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।