ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে আবারও সামরিক অভিযান শুরু করার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে সৌদি আরব। একাধিক মার্কিন ও আঞ্চলিক কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, হুথিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজন হলে আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযান চালাতে রিয়াদকে বিস্তৃত স্বাধীনতা বা ‘সবুজ সংকেত’ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি সৌদি নেতৃত্ব।
মিডল ইস্ট আই-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান সম্প্রতি এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে ওয়াশিংটন রিয়াদের ওপর আগের মতো বিধিনিষেধ আরোপ করছে না।
তবে কীভাবে হুথিদের মোকাবিলা করা হবে, তা নিয়ে সৌদি রাজপরিবারের ভেতরে মতপার্থক্য রয়েছে বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন ও এক পশ্চিমা কর্মকর্তা। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
চার বছর ধরে কার্যত চলা সৌদি-হুথি যুদ্ধবিরতি সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলায় নতুন করে চাপে পড়েছে। চলতি মাসের শুরুতে ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অংশ নিতে হুথি কর্মকর্তাদের বহনকারী একটি বিমান সানার বিমানবন্দরে অবতরণের পর উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।
হুথিদের অভিযোগ, বিমানটি ফিরে যাওয়া ঠেকাতে সৌদি আরব সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। যদিও জাতিসংঘ-সমর্থিত যুদ্ধবিরতির আনুষ্ঠানিক মেয়াদ শেষ হয়েছে, এতদিন উভয় পক্ষ অনানুষ্ঠানিকভাবে একটি সমঝোতা মেনে চলছিল, যার আওতায় ইয়েমেনে ফ্লাইট পরিচালিত হতো মূলত জর্ডানের আম্মান ও মিসরের কায়রো থেকে।
মার্কিন ও আঞ্চলিক সূত্রের দাবি, সানায় অবতরণ করা বিমানে লেবানন, ইরান, সিরিয়া ও ইরাকের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সামরিক কর্মকর্তারা ছিলেন। ফেরার ফ্লাইটে ইরানে প্রশিক্ষণের জন্য মনোনীত হুথি কর্মকর্তা ও জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতাদের যাওয়ার কথা ছিল।
এর জবাবে চলতি সপ্তাহে সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় আবহা শহরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় হুথিরা।
বৃহস্পতিবার টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে হুথি নেতা আবদুল মালিক আল-হুথি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, রিয়াদ আবার ইয়েমেনে হামলায় জড়ালে সৌদি আরবের সব তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের লক্ষ্যবস্তু হবে। তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দরের বদলে বিমানবন্দর, বন্দরের বদলে বন্দর এবং অবরোধের বদলে অবরোধ হবে।’
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন করে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হলে তা শুধু ইয়েমেনের মানবিক সংকটই বাড়াবে না, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার কারণে বর্তমানে লোহিত সাগরই সৌদি তেল রপ্তানির প্রধান রুট। ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশটি প্রতিদিন প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল তেল লোহিত সাগর দিয়ে রপ্তানি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আল-বাসা বলেন, হুথিদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করতে হলে সৌদি আরবকে কয়েকশ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে। আর যুদ্ধ শুরু হলে সৌদির জয়ের সম্ভাবনা ‘৫০-৫০’।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা যুদ্ধ শুরুর পর ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানিয়ে লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক জাহাজে হামলা শুরু করে হুথিরা। পরে ২০২৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুথিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিমান হামলার নির্দেশ দিলেও সৌদি আরবের অনুরোধে উপসাগরীয় সফরের আগে সেই অভিযান স্থগিত করেন। এরপর থেকে ২০২৫ সালের মে মাসের সমুদ্রবিষয়ক যুদ্ধবিরতি মোটামুটি বজায় ছিল।
বর্তমানে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অধিকাংশ জনবহুল এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্যদিকে সৌদি আরব সমর্থন দিচ্ছে এডেনভিত্তিক আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে।
উত্তেজনা বাড়তে থাকায় সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সমর্থন আরও জোরদার করার চেষ্টা করছে। এ লক্ষ্যে বুধবার রিয়াদে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের উপ-কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল প্যাট্রিক ফ্রাঙ্ক সৌদি সেনাপ্রধান ফায়াদ আল-রুয়াইলির সঙ্গে বৈঠক করেন। একই দিনে সৌদি আরবের কাছে ২০ হাজার অ্যাডভান্সড প্রিসিশন কিল উইপন সিস্টেম বিক্রির অনুমোদনের কথাও ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তিবদ্ধ পাকিস্তানও হুথিদের সৌদি ভূখণ্ডে নতুন হামলা চালানো থেকে বিরত থাকার সতর্কবার্তা দিয়েছে।