আত্মহত্যার আগে ফেসবুকে পোস্ট ‘একদম ভেঙেচুরে শেষ হয়ে গেলাম’

রাজধানীর ডেমরা পুলিশ লাইনস ভবন থেকে মো. সাইদুল ইসলাম (২১) নামে এক পুলিশ কনস্টেবলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার (১৭ জুলাই) সকালে সহপাঠীরা উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, পারিবারিক কলহ থেকে হতাশা এবং তারপর গলায় ফাঁস নিয়ে মৃত্যু হয়েছে তার।

​নিহত সাইদুল ইসলাম ফেনী সদর উপজেলার লেমুয়া উত্তর চাঁদপুর গ্রামের মো. সাদেকের ছেলে। তার পুলিশ বিপি নম্বর: ০৭২৬২৬৬৪৬৫। তিনি ডেমরা পুলিশ লাইনের ২০ তলা ভবনের নবম তলার একটি কক্ষে থাকতেন। মাত্র ৯ মাস আগে তিনি পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরিতে যোগদান করেছিলেন।

তার চাচা মো. সোহাগ জানান, পারিবারিক কলহের জেরে সাইদুল কিছুদিন ধরে চরম বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। গতরাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে ডেমরা পুলিশ লাইনের ওই ভবনের সপ্তম তলায় নিজের রুমে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে বিছানার চাদর পেঁচিয়ে ফাঁস দেন। ​পরে তাকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয় বলে চিকিৎসকরা জানান।

​ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (পরিদর্শক) মো. ফারুক চিকিৎসকের বরাত দিয়ে মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেক হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট থানাকে অবহিত করা হয়েছে এবং পুলিশ এ বিষয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে।

এদিকে মৃত্যুর পূর্বে নিজের ফেসবুকে এক পোস্টে সাইদুল লিখে গেছেন হতাশার কথা।

পোস্টে সাইদুল লিখেন, তোমায় কেন্দ্র করে আমি যে জগৎ সাজিয়ে গুছিয়ে গড়ে তুলেছিলাম একটু একটু করে, হঠাৎ যেন সে জগৎটাকে দুইদিনেই  চোখের সামনে ভেঙেচুরে চুরমার করে দিলে। আমি সবকিছু চুপচাপ দেখে গেলাম। সমুদ্রের মাঝখানে তরী ডোবা মানুষ অনেকক্ষণ সাঁতার কাটার পর যেমন কুলের দেখা না পেয়ে শেষমেশ নিয়তিকে মেনে নেয়, সদরে গ্রহন করে মৃত্যুকে, তেমনি আমারও যেন কিছুই করার নেই।

পোস্টে হতাশ হয়ে কনস্টেবল লিখেন, কত তুচ্ছ বাহানা দিয়ে মানুষ একটা গভীরতম সম্পর্কের ইতি টানে, আমি অবাক হই, মানুষ আসলেই কী মানুষকে ভালোবাসে..?

তিনি বলেন, জানো.?  মাঝে মাঝে কেন জানি নিজেরে দেখলে নিজের অনেক মায়া লাগে, হাহাকার লাগে কি হয়ে গেলাম কি বানাইয়া গেলা, আচ্ছা বলতো আমার দোষটা কি ছিল.?  কি করছিলাম আমি.? তোমারে ভালোবাসাটা অপরাধ.?  নাকি সব কিছু উপেক্ষা করে তোমাকে বিয়ে করাটা অপরাধ.? 

তুমি না বলছিলা মৃত্যু ছাড়া তুমি কখনোই আমাকে ছেড়ে যাবে না প্রশ্ন করে তিনি বলেন, এখন কই তুমি? আমিতো তোমার অভাবেই শেষ হয়ে গেলাম, অনেকবারই তো আঘাত করছো সব ভুলে বার বার মাপ করে তোমাকে বুকে টেনে নিলাম এই মূল্য দিলা.? একেবারেই শেষ করে দিতে আসলা? আমি তো নিয়তি মেনে নিয়ে দুরেই ছিলাম তোমার থেকে কেন আবার আসছিলা কেন এত কাছে আসচিলা? কোন উত্তর খুঁজে পাইনা আমি। 

তিনি বলেন, শুধু দ্বিতীয় বার না, তৃতীয় বার না, চতুর্থ বার না, আমি হাজার বার সুযোগ দিয়েছি। কিন্তু তুমি প্রতিবার'ই আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছো মানুষকে এতটাও বিশ্বাস করতে হয়না। যে বিশ্বাস করলে নিজেই আর বাঁচার সুযোগ থাকেনা। 

হারিয়ে ফেলতে চাইনি বলে'ই আমাদের সম্পর্কের নাম দিয়েছি স্বামী-স্ত্রী জানিয়ে পোস্টে সাইদুল লিখেন,  যদি তোমাকে হারানোর ইচ্ছে থাকত, যদি এই ভালোবাসা ক্ষণিকের মোহ হতো তবে কখনোই এত পবিত্র এক বন্ধনের নামে তোমাকে নিজের বলে ঘোষণা করতাম না। কখনোই তোমাকে নিজের নামে লিখিত করতাম না। আমার কাছে এই সম্পর্ক কোনো সাময়িক অনুভূতি নয় এটি আজীবনের অঙ্গীকার, বিশ্বস্ততা আর একে অপরকে পাশে থাকার নীরব শপথ ছিল কিন্তু তুমি সব শেষ করে দিলা। আচ্ছা যদি যাওয়ারই ছিল আসছিলাই কেন.?

তিনি লিখেন, বহুকাল বয়ে বেড়াতে হবে হৃদয় ভাঙ্গা এই ব্যাথা, হয়তো এই জন্মে আর সেরে উঠবে না মৃত্যু ছাড়া। তাই আমি সেই পথেই গেলাম। সারা জীবন মানুষরে" বুঝাইলাম অথচ দিন শেষ এসে দেখি আমি নিজেই অবুঝ..!

যাও ভলো থালো যতটুকু দূরত্ব নিয়ে তুমি চলে গেলে তার থেকে দ্বিগুণ দূরত্ব নিয়ে আমি হারিয়ে গেলাম সুখে থাকো এটাই কামনা জানিয়ে তিনি লিখেন, তোমাকে বলেছিলাম না এটাই আমার শেষ শক্তি হয়তো তুমি, নয়তো আমি শেষ।নাও তারও প্রমাণ দিলাম সারা জীবন তো প্রমাণই দিয়ে আসলাম তারপরও। যাই হোক। তুমি তো জানোই চাইলে আমি অনেক কিছুই করতে পারতাম কিন্তু আমার প্রতিপক্ষ তো তুমি হয়ে গেলা কি আর করবো, যাও প্রমাণ সব তোমার অনুকূলে কারন আমার পক্ষের উকিল হচ্ছে এমন নীরবতা আমার নীরবে হারিয়ে যাওয়া, যেখানে তুমি জবানবন্দি দিলে আর তুমি দিলে বিচ্ছেদের চূড়ান্ত রায়। 

পোস্টে দুঃখিত আম্মু আব্বু আপনাদের ছেলে আর নিতে পারতেসে না উল্লেখ করে সাইদুল বলেন, আম্মু আর পারতেসি না আর তিলে তিলে মরার শক্তি আমার নাই। মাপ করবেন আপনাদের অযোগ্য ছেলেকে। আমার যেন আর কিছুই করার নাই। একদম ভেঙে চুরে শেষ হয়ে গেলাম।