১০ সন্তানের বাবা-মা, তবু জোটে না দুবেলা খাবার; ভাঙা ঘরে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন দম্পতি

সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাট ইউনিয়নের বানিয়াগাঁতী গ্রামের ৯০ বছর বয়সী আছাব আলী ও তার ৮০ বছর বয়সী স্ত্রী সালেকা বেগম চরম দারিদ্র্য, বার্ধক্য ও অসুস্থতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। পাঁচ ছেলে ও পাঁচ মেয়েসহ ১০ সন্তানের বাবা-মা হয়েও দুবেলা খাবার জোগাড়ে তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে প্রতিবেশীদের সহায়তার ওপর। স্থানীয়দের দাবি, সন্তানদের মানুষ করে সংসার গুছিয়ে দিলেও জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তারা সন্তানের প্রত্যাশিত সহায়তা পাচ্ছেন না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাট ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বানিয়াগাঁতী গ্রামে বসবাস করেন আছাব আলী ও সালেকা বেগম। বয়সের ভারে ন্যুব্জ আছাব আলী প্রায় চলাফেরার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। নিজের পায়ে হাঁটতে পারেন না, দৈনন্দিন কাজও অন্যের সহায়তা ছাড়া সম্ভব হয় না। তার স্ত্রী সালেকা বেগমও নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। তবু নিজের অসুস্থতা উপেক্ষা করে প্রতিদিন স্বামীর দেখভাল করে যাচ্ছেন তিনি। কখনো স্বামীকে ধরে বাইরে নিয়ে যান, আবার কখনো মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে সাহায্যের আবেদন করেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় অনেক কষ্ট করে আছাব আলী তার সন্তানদের বড় করেছেন। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া, বিয়ে এবং সংসার গুছিয়ে দিতে জীবনের সবটুকু শ্রম দিয়েছেন। কিন্তু এখন শেষ বয়সে এসে সেই সন্তানরাই বাবা-মায়ের খোঁজ নেন না। ফলে খাদ্য, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতেই চরম সংকটে পড়েছেন এই দম্পতি।

প্রতিবেশীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের বসতঘরও মানবেতর অবস্থায় রয়েছে। জরাজীর্ণ টিনের চাল, ছিদ্রযুক্ত বেড়া আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তারা বসবাস করছেন। বৃষ্টি হলেই ঘরের ভেতরে পানি পড়ে। নেই ভালো শৌচাগার, নেই প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র। একটি ভালো খাটও তাদের ভাগ্যে জোটেনি। বাঁশের তৈরি একটি মাচার ওপর চট বিছিয়ে রাত কাটাতে হয় তাদের। বার্ধক্য ও অসুস্থতার কারণে প্রতিটি দিন-রাত তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা জুরান আলী বলেন, আছাব আলী ও সালেকা দম্পতির পাঁচ ছেলে ও পাঁচ মেয়ে মিলিয়ে মোট ১০টি সন্তান। সবাইকে অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছেন। কিন্তু এখন কেউই বাবা-মায়ের দায়িত্ব নিচ্ছেন না। এ কারণে দুবেলা খাবার জোগাড় করাও তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

প্রতিবেশী মরিয়ম বেগম বলেন, ‘চাচা-চাচিকে এই কষ্টে দেখতে খুব খারাপ লাগে। আমরা যার যা সামর্থ্য আছে, তাই দিয়ে সাহায্য করার চেষ্টা করি। কিন্তু এভাবে তো আর কতদিন চলবে? জীবনের শেষ সময়ে তাদের পাশে সমাজের সবাই দাঁড়ানো উচিত।’

আরেক প্রতিবেশী কামাল শেখের ভাষ্য, ‘এত ছেলে-মেয়ে থাকার পরও বাবা-মায়ের এই অবস্থা মেনে নেওয়া যায় না। এই বয়সে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল সন্তানদের ভালোবাসা ও যত্ন। কিন্তু তারা পেয়েছেন শুধু অবহেলা।’

এদিকে স্থানীয়ভাবে তাদের সহায়তায় উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন সমাজকর্মীরা। সমাজকর্মী মামুন বিশ্বাস বলেন, সবার সহযোগিতায় অন্তত ৭০ হাজার টাকা সংগ্রহ করে আছাব আলী ও সালেকা বেগমের জন্য একটি চলাচল-উপযোগী হুইলচেয়ার বা সহায়ক যান, খাদ্যসামগ্রী এবং জরুরি প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘মানুষ মানুষের জন্য। সামান্য সহযোগিতাও তাদের জীবনের শেষ সময়টুকু স্বস্তির করে তুলতে পারে।’

সহায়তার আবেদন জানিয়ে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে সালেকা বেগম বলেন, ‘আমরা আর কিছু চাই না বাবা। শুধু দুবেলা ভাত খেয়ে, একটু শান্তিতে বাকি জীবনটা কাটাতে চাই। আল্লাহ যেন সবাইকে ভালো রাখেন।’

ভদ্রঘাট ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. সোহাগ মণ্ডল জানান, উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে আছাব আলী ও সালেকা দম্পতির নামে বয়স্ক ভাতার কার্ড করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী নিয়মিত সহায়তা দেওয়া হয়। তবে তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো ১০টি সন্তান থাকা সত্ত্বেও শেষ বয়সে তাদের খোঁজ নেওয়ার মতো কেউ নেই। সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষ যদি তাদের পাশে দাঁড়ান, তাহলে জীবনের শেষ সময়টুকু তারা অন্তত সম্মান আর স্বস্তির সঙ্গে কাটাতে পারবেন।’