সাম্প্রতিক টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ধস ও পাহাড়ি ঢলে রাঙ্গামাটিতে, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তলিয়ে গেছে হাজার হাজার একর ফসলি জমি, ধ্বংস হয়েছে গবাদি পশু ও পোলট্রি খামার, পুকুর, ক্রিক ও জলাশয় প্লাবিত হয়ে মাছ ও পোনা ভেসে গেছে বা নষ্ট হয়েছে। সরকারি হিসাব মতে জেলায় কৃষি খাতে প্রায় ৫১ কোটি, প্রাণিসম্পদ খাতে প্রায় ২ কোটি এবং মৎস্য খাতে প্রায় ৪ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এমনিতে ঘরবাড়ি, দোকানপাট পানির নিচে তলিয়ে গেছে। পানি নেমে যাওয়ার পর এসব ঘরবাড়ি দোকানপাট মেরামত করতে যেখানে ক্ষতিগ্রস্তরা হিমশিম খাচ্ছে সেখানে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের ক্ষতি হয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার ১০ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যায়। কোথাও ফসলসহ জমি ডুবে গেছে, কোথাও আবার বীজতলা নষ্ট হয়েছে। শাকসবজি, আদা, হলুদ, মরিচসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
রাঙ্গামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান জানান, জেলার ১০টি উপজেলার কমবেশি কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঘাইছড়ি ও বিলাইছড়ি উপজেলায়। জেলায় মোট ৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কৃষক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। কৃষি খাতে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৫১ কোটি টাকা ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আউশ ধান, রোপা আমনের বীজতলা এবং বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষে ।
রাঙ্গামাটি জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলার ১০ উপজেলার ২৯টি ইউনিয়নের ২২৩টি মৎস্য খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ৯৭ দশমিক ৬৭ হেক্টর পুকুর, ক্রিক ও জলাশয় প্লাবিত হয়ে ৮৯ মেট্রিক টন ফিন ফিশ এবং প্রায় ২২ লাখ মাছের পোনা ভেসে গেছে বা নষ্ট হয়েছে ।
রাঙ্গামাটি জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, “টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জেলার বিভিন্ন এলাকার পুকুর, ক্রিক ও জলাশয় প্লাবিত হওয়ায় বিপুল পরিমাণ মাছ ও পোনা ভেসে গেছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য খাতের প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির তালিকা ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
রাঙ্গামাটি জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য মতে জেলার ১৮৫টি গবাদি পশুর খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে । এসব খামারে থাকা ১ হাজার ২২০টি গবাদি পশু ক্ষতির মুখে পড়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি । এছাড়া ১৬৬টি হাঁস-মুরগির খামারে থাকা ৩৭ হাজার ৯২৮টি হাঁস-মুরগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৬২ লাখ টাকা । এছাড়াও গবাদি পশুর দানাদার ও অন্যান্য সহ প্রায় ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
রাঙ্গামাটি জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের তালিকা প্রস্তুত করে জেলা প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। মাঠপর্যায়ে ভেটেরিনারি মেডিক্যাল টিম টিকাদান, চিকিৎসাসেবা ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।”
রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেছেন, সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহ থেকে ক্ষয়ক্ষতির তালিকা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে।