গাজার বুক চিরে ইসরায়েলের বিশাল মাটির প্রাচীর নির্মাণ

গাজা উপত্যকার ৫০ শতাংশের বেশি নিয়ন্ত্রিত এলাকা বাকি অংশ থেকে আলাদা করতে গোপনে এবং দ্রুতগতিতে একটি বিশাল মাটির প্রাচীর বা প্রতিবন্ধক নির্মাণ করছে ইসরায়েল। স্যাটেলাইট চিত্রে এমন তথ্য উঠে এসেছে, যা গাজা ভূখণ্ডটি স্থায়ীভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা আরো তীব্র হচ্ছে। এদিকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় দুই ফিলিস্তিনি নিহত ও বহু আহত হয়েছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া শহরগুলোর মধ্য দিয়েই তৈরি করা হয়েছে ২৩ কিলোমিটারের (১৪ মাইল) বেশি দীর্ঘ এই প্রাচীর । উপকূলীয় এই ভূখণ্ডটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ৪০ কিলোমিটার (২৫ মাইল) এবং চওড়ায় ১১ কিলোমিটার (সাত মাইল), যেখানে ২০ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনি বসবাস করে। অর্থাৎ, পুরো ভূখণ্ডের দৈর্ঘ্যের অর্ধেকেরও বেশি অংশ জুড়ে ইতিমধ্যে এই প্রাচীর গড়ে তোলা হয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্র দেখানোর পর ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) নিশ্চিত করে জানিয়েছে, তারা ‘ইয়েলো লাইন' এলাকায় একটি ভৌত প্রাচীর নির্মাণ করেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় হামাসের সঙ্গে সমঝোতার পর এই সীমারেখা পর্যন্ত সেনা প্রত্যাহার করেছিল ইসরায়েল। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত ঐ চুক্তিতে পূর্ণাঙ্গ সেনা প্রত্যাহারের আগ পর্যন্ত এই রেখাকে সাময়িক বিভাজন হিসেবে ভাবা হয়েছিল।

তবে যুদ্ধবিরতি কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। হামাস নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজার নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানানোয় ইসরায়েল সেখানে নিজেদের অবস্থান আরো শক্ত করছে বলে মনে করা হচ্ছে । এতে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, সাময়িক এই বিভাজনরেখা স্থায়ী সীমান্তে পরিণত হতে পারে। যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড এবং গাজার ভবিষ্যৎ তদারকির জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন বোর্ড অব পিস—কোনো পক্ষই এই প্রাচীর নির্মাণের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

এদিকে আইডিএফ জানিয়েছে, প্রতিবন্ধকের পাশাপাশি ঐ রেখা ঘিরে গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতাসম্পন্ন একটি 'নিরাপত্তা অঞ্চল'ও গড়ে তোলা হয়েছে। তবে প্রাচীরটি ঠিক কত দূর পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানায় তারা। আইডিএফের দাবি, এ  প্রাচীরের উদ্দেশ্য হলো অনুপ্রবেশ ঠেকানো এবং গাজার কাছাকাছি অবস্থানরত ইসরায়েলি সেনা ও সীমান্তবর্তী ইসরায়েলি জনপদগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ।

এদিকে গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা অব্যাহত রেখেছে দখলদার বাহিনী। আর এই ধারাবাহিক হামলার মধ্যে সোমবার গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি গোলাবর্ষণ ও বিমান হামলায় অন্তত দুই জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং আরো অনেকে আহত হয়েছে। এদিন ইসরায়েলি গোলাবর্ষণের লক্ষ্যবস্তু ছিল গাজা সিটির দক্ষিণ- পূর্বাঞ্চলের জেইতুন এলাকার কাশকো স্ট্রিটে জড়ো হওয়া বেসামরিক মানুষের একটি সমাবেশ । গাজার চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলার পর দুই ফিলিস্তিনির মরদেহ আল-শিফা হাসপাতালে আনা হয় । এদিকে একই সূত্র জানায়, গাজা সিটির পশ্চিমাঞ্চলের ঈদিয়া স্ট্রিটে একটি আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি হেলিকপটারের হামলায় নারী ও শিশুসহ বেশ কয়েক জন ফিলিস্তিনি আহত হয়। এ সংক্রান্ত আরেকটি ঘটনায় ইসরায়েলি যুদ্ধজাহাজ গাজা সিটির উপকূলীয় এলাকায় গুলি ও ভারী অস্ত্রের গোলাবর্ষণ চালায়। একই সময়ে উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থীশিবিরের পূর্বাঞ্চলেও ইসরায়েলি হেলিকপটার ও কামান থেকে গোলাবর্ষণ করা হয়। গাজার দক্ষিণাঞ্চলে একটি চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে, খান ইউনিসের উত্তরে হামাদ আবাসিক কমপ্লেক্সের কাছে ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে এক ফিলিস্তিনি আহত হন । প্রত্যক্ষদর্শীরা আরো জানান, ইসরায়েলি কামান থেকে শেখ নাসের এলাকা এবং বানি সুহেইলা মোড়ের আশপাশে গোলাবর্ষণ করা হয় । তবে এসব হামলায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ফিলিস্তিনিরা বলছেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গোলাবর্ষণ ও স্থল অভিযান অব্যাহত থাকায় এবং সীমান্ত ক্রসিংগুলো প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার কারণে গাজায় শুধু সীমিত পরিমাণ ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, তাই যুদ্ধবিরতি কার্যত একটি 'মরীচিকা' ছাড়া আর কিছু নয় । এর ফলে গাজায় মানবিক সংকট আরো গভীর হয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনকারী ইসরায়েলি অব্যাহত হামলায় ১ হাজার ১২৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৩ হাজার ৬৪৩ জন আহত হয়েছে। এছাড়া, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে এ পর্যন্ত ৭৩ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৩ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছে।