ইউক্রেনে টানা বিক্ষোভের মুখে সেনাপ্রধানকেও সরিয়ে দিলেন জেলেনস্কি

ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ওলেক্সান্দর সিরস্কিকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে জেনারেল মিখাইলো দ্রাপাতিকে নিয়োগ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতির মধ্যেই এই পরিবর্তন আনা হলো।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, টানা ছয় দিন ধরে রাজধানী কিয়েভে বিক্ষোভ চলছে। পরে তা ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকে অপসারণের প্রতিবাদে এ বিক্ষোভের শুরু। বিক্ষোভ থেকে সেনাপ্রধান ওলেক্সান্দর সিরস্কির অপসারণের দাবি ওঠে।

রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে মিখাইলো ফেদোরভ আর ওলেক্সান্দর সিরস্কির বিরোধ সাম্প্রতিক দিনগুলোয় প্রকাশিত হয়ে পড়ে। মূলত এর জেরেই প্রতিরক্ষামন্ত্রীর অপসারণ, বিক্ষোভ। শেষ পর্যন্ত টানা বিক্ষোভের মুখে সেনাপ্রধানকেও সরিয়ে দিলেন প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি।

রাজনৈতিক মহলে আগে থেকেই আলোচনা ছিল, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফেদোরভ ও সেনাপ্রধান সিরস্কির মধ্যে নীতিগত মতপার্থক্য ছিল। পরে সেই ধারণারই প্রতিফলন দেখা যায়। ৩৫ বছর বয়সী ফেদোরভকে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সামরিক সংস্কারে ভূমিকার জন্য প্রশংসা করা হলেও ৬০ বছর বয়সী সিরস্কির বিরুদ্ধে পুরোনো ধাঁচের নেতৃত্ব অনুসরণের অভিযোগ ছিল।

নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া ৪৩ বছর বয়সী জেনারেল মিখাইলো দ্রাপাতি যুদ্ধক্ষেত্রে দক্ষ নেতৃত্বের জন্য পরিচিত। দায়িত্ব গ্রহণের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন,  ‘আজ যারা আমাদের দেশ রক্ষা করছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আমি পূর্ণ মনোযোগ ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করব।’ একই সঙ্গে তিনি সেনাবাহিনীর উন্নয়নে সিরস্কির অবদানেরও প্রশংসা করেন।

এর আগে এক ভিডিও বার্তায় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি সিরস্কির দীর্ঘ সামরিক সেবার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বিশেষ করে ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের শুরুতে রাজধানী কিয়েভের প্রতিরক্ষায় তার ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন তিনি। বিবৃতিতে জেলেনস্কি বলেন, ‘ইউক্রেনের শক্ত অবস্থান ধরে রাখার জন্য আমি ওলেক্সান্দর সিরস্কি এবং আমাদের প্রত্যেক যোদ্ধার প্রতি কৃতজ্ঞ। একই দৃষ্টিভঙ্গির জন্য মিখাইলো দ্রাপাতিকেও ধন্যবাদ।’

ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভকে অপসারণের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্স

গত সপ্তাহে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পান ইউক্রেনের নিরাপত্তা সংস্থা এসবিইউর সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইয়েভহেনি খমারা। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানিয়েছেন, সামরিক নেতৃত্বে নেওয়া সব পরিবর্তন আনুষ্ঠানিকভাবে পরদিন থেকে কার্যকর হবে।

এদিকে নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে দ্রাপাতির নিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছেন সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফেদোরভ। তিনি এটিকে ইউক্রেনের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের সংগ্রামে নতুন সম্ভাবনার সূচনা হিসেবে উল্লেখ করেন।

চলতি বছরের শুরুতে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়া ফেদোরভ যুদ্ধ পরিচালনায় তথ্যনির্ভর কৌশল, ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ডিজিটাল সামরিক ব্যবস্থাপনা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এর আগে তিনি ডিজিটাল রূপান্তরবিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে সাইবার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য 'আইটি আর্মি অব ইউক্রেন' গঠনে নেতৃত্ব দেন। পাশাপাশি ‘আর্মি অব ড্রোনস’ কর্মসূচির মাধ্যমে সেনাবাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও অবদান রাখেন।

বিশ্লেষকদের মতে, জনপ্রিয় ফেদোরভকে সরিয়ে দেওয়ার পর যে জনঅসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, তা প্রশমনের অংশ হিসেবেই তুলনামূলক তরুণ ও আধুনিক চিন্তার সামরিক কর্মকর্তা দ্রাপাতিকে সেনাপ্রধান করা হয়েছে। একই সঙ্গে দ্রাপাতি ও ফেদোরভের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও সামরিক নেতৃত্বে সমন্বয় ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।