চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বিশ্বে হামে সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত দেশে হাম বা হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন ৪২ হাজার ১৭৪ জন। একই সময়ে বিশ্বের আর কোনো দেশে এত রোগী শনাক্ত হয়নি।
ডব্লিউএইচওর জেনেভা সদর দপ্তরে জমা হওয়া বৈশ্বিক নজরদারি তথ্য এবং সংস্থাটির জুলাই মাসের প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। ১৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)ও তাদের মূল্যায়নে এই প্রতিবেদন ব্যবহার করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাম সংক্রমণে বাংলাদেশের পরেই রয়েছে ভারত। দেশটিতে ছয় মাসে আক্রান্ত হয়েছেন ২৬ হাজার ৬০৭ জন। এরপর রয়েছে ইয়েমেন (১৪ হাজার ৫২১), মেক্সিকো (১২ হাজার ৪৯৫), পাকিস্তান (১১ হাজার ৩৭), ক্যামেরুন (৯ হাজার ৬৫৩), কাজাখস্তান (৭ হাজার ৭৩০), গুয়েতেমালা (৬ হাজার ৮৩২), অ্যাঙ্গোলা (৬ হাজার ৮১৫) এবং সুদান (৫ হাজার ৭৬৬)।
ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, একই সময়ে বিশ্বের ১৬৫টি দেশে মোট ১ লাখ ৮৬ হাজার হাম বা হামের উপসর্গের রোগী শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৪৮ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৪ হাজার ৭০৮ জনের সংক্রমণ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে ৭০২ জন এবং নিশ্চিত হামে আক্রান্ত ৯৫ শিশুসহ মোট ৭৯৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
ডব্লিউএইচওর তথ্য বলছে, মার্চ মাসে দেশে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৫ হাজারে পৌঁছায়। এপ্রিলে তা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যায় এবং মে মাসে নতুন রোগী শনাক্ত হয় প্রায় ১৫ হাজার।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, চূড়ান্ত হিসাবেও বাংলাদেশ হাম সংক্রমণে বিশ্বের শীর্ষেই থাকবে। শুধু সংক্রমণ নয়, হামে মৃত্যুর সংখ্যাও বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির কাভারেজ কমে যাওয়াই বর্তমান পরিস্থিতির প্রধান কারণ। একসময় জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে শতভাগ সাফল্য অর্জন করলেও ২০২৫ সালে নিয়মিত হাম টিকাদানের হার নেমে আসে ৫৯ শতাংশে। একই সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় টিকার সংকটও দেখা দেয়।
ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি অংশ প্রয়োজনীয় দুই ডোজ টিকার একটিও পায়নি। বিশেষ করে এক বছরের কম বয়সী এবং এক থেকে নয় বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে টিকাবঞ্চিতের হার বেশি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, হাম প্রতিরোধে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনতে না পারলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বজায় রাখা সম্ভব হবে না। ফলে ভবিষ্যতেও বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি থেকে যাবে।
এ পরিস্থিতিতে ডব্লিউএইচও, ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দ্রুত টিকাবঞ্চিত শিশুদের শনাক্ত করে টিকাদানের আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।