এআই-নির্ভর সম্পদ কেন্দ্রীকরণ নাকি নতুন মানবিক সভ্যতা, বিশ্বকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে: প্রফেসর ইউনূস

বিশ্ব এখন এক সভ্যতার অবসান এবং নতুন এক সভ্যতার সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে আছে বলে মন্তব্য করেছেন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিদ্যমান বৈষম্যের সমাধান করবে না; বরং সম্পদের কেন্দ্রীকরণ আরও ত্বরান্বিত করতে পারে। তাই মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক নতুন সভ্যতা গড়ে তুলতে এখনই বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, বর্তমান বিশ্ব এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একটি ব্যর্থ সভ্যতার অবসান ঘটছে এবং নতুন একটি সভ্যতার জন্মের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে সেই নতুন সভ্যতা হবে সম্পদকেন্দ্রিক, নাকি মানবিক মূল্যবোধনির্ভর সে সিদ্ধান্ত বিশ্বকে এখনই নিতে হবে।

ইতালির কাস্তেল গানদোলফোর ‘বর্গো লাউদাতো সি’ তে গত ১৬ জুলাই অনুষ্ঠিত ‘গ্লোবাল নোবেল লরিয়েটস অ্যাসাম্বলি অন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড নিউক্লিয়ার ওয়ার’ এর উদ্বোধনী অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বুধবার (২২ জুলাই) ইউনূস সেন্টারের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রফেসর ইউনূস বলেন, বর্তমান সভ্যতার অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্যই আত্মবিনাশী। পরিবেশ ধ্বংস এবং ক্রমবর্ধমান সম্পদ কেন্দ্রীকরণ এই দুটি বড় সংকট বিদ্যমান ব্যবস্থার ব্যর্থতার প্রধান কারণ। অথচ প্রচলিত বৈশ্বিক কাঠামো এ সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান দিতে পারেনি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনেকের ধারণা নতুন প্রযুক্তি সব সমস্যার সমাধান করবে। কিন্তু বাস্তবে এআই সম্পদের কেন্দ্রীকরণ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এবং আরও বেশি সম্পদ অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে চলে যেতে পারে।

এআইয়ের কারণে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আশঙ্কার প্রসঙ্গ তুলে প্রফেসর ইউনূস বলেন, প্রকৃত সমস্যা চাকরি হারানো নয়; বরং এমন একটি শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যা মানুষকে কেবল চাকরিপ্রার্থী হিসেবে গড়ে তোলে। তার ভাষায়, মানুষ জন্মগতভাবেই সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী; অন্যের নির্দেশ পালন করাই মানুষের একমাত্র উদ্দেশ্য হতে পারে না।

তরুণদের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং প্রচলিত কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করার মানসিকতার কারণে বর্তমান প্রজন্ম মানব ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রজন্ম। এখন আর তরুণদের কী করতে হবে, তা বলে দেওয়ার সময় নয়; বরং তাদের কাছ থেকেই জানতে হবে তারা কেমন পৃথিবী গড়তে চায় এবং উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া এই পৃথিবীতে কী অনুপস্থিত।

প্রফেসর ইউনূস বলেন, ‘আমাদের এমন একটি ভবিষ্যৎ বিশ্ব গড়তে হবে, যা নিয়ে আমরা সত্যিই গর্ব করতে পারি।’ এ লক্ষ্য অর্জনে তিনি সম্মেলনে অংশ নেওয়া প্রতিনিধি ও তরুণদের বাস্তবসম্মত ও কার্যকর ধারণা নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নোবেল বিজয়ী, সাবেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, ধর্মীয় নেতা এবং তরুণ প্রতিনিধিরা অংশ নেন। উদ্বোধনী অধিবেশনে আরও বক্তব্য দেন বর্গো লাউদাতো সি’র সভাপতি কার্ডিনাল ফাবিও বাজ্জিও, প্রো-প্রিফেক্ট কার্ডিনাল অ্যাঞ্জেল ফার্নান্দেজ আরতিমে এবং গ্লোবাল নোবেল লরিয়েটস অ্যাসাম্বলির সভাপতি ও ডোমাস কম্যুনিস ফাউন্ডেশনের এমেরিটাস সভাপতি কার্ডিনাল সিলভানো মারিয়া তোমাসি।

এছাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বুলেটিন অব দ্য অ্যাটোমিক সায়েন্টিস্টস এর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড্যানিয়েল হোল্‌জ, পন্টিফিসিয়াল অ্যাকাডেমিস অব সায়েন্সেস এর চ্যান্সেলর কার্ডিনাল পিটার টার্কসন, পন্টিফিসিয়াল অ্যাকাডেমি ফর লাইফ এর সভাপতি আর্চবিশপ রেনজো পেগোরারো, হলিউড অভিনেত্রী ও মানবাধিকারকর্মী শ্যারন স্টোনসহ বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

সমাবেশ শেষে রোমানো প্রোদি, জোডি উইলিয়ামস, মারিয়া রেসা, ডেনিস মুকওয়েগে এবং হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোসসহ বিভিন্ন দেশের নোবেল বিজয়ীরা একটি যৌথ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন। ঘোষণাপত্রে সতর্ক করে বলা হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পারমাণবিক অস্ত্রের সমন্বিত বিকাশ মানবজাতির ভবিষ্যতের জন্য অভূতপূর্ব হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।