আবার অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধ ও আতঙ্কিত বিশ্ব!

যুদ্ধবিরতি ভাঙিয়া পড়িবার পর যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ ভয়াবহ আকার ধারণ করিয়াছে। বর্তমানে পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ চলিতেছে। নূতন করিয়া সংঘাত শুরু হইবার ১২ দিনের মাথায় মার্কিন সেনাবাহিনী ইরানের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে তথা সামরিক পরিচালনা কেন্দ্র, বিমান হ্যাঙ্গার, ড্রোন মজুতাগার ও রসদ সরবরাহ অবকাঠামোতে বি-১ দূরপাল্লার বোমারু বিমান ব্যবহার করিয়াছে। যুক্তরাজ্যের একটি বিমানঘাঁটি হইতে উড়িয়া আসা এই বোমারু বিমান ২৪টি বিপুল ওজনের বোমা বা অসংখ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম। ইহা হইতে যুদ্ধের ভয়াবহতা সহেজই উপলব্ধি করা যায়। এই দিকে লোহিতসাগরে সৌদি জাহাজে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা হামলা করায় বাব-আল-মানদেব প্রণালিতে নূতন করিয়া দেখা দিয়াছে উত্তেজনা। ইহার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে কোনো জাহাজের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট, ড্রোন বা অন্য কোনো উপায়ে কিংবা অস্ত্র দিয়া ইরান হামলা চালাইলে ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালাইবার হুমকি দিয়াছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

হরমুজ ও বাব-আল-মানদেব প্রণালি বিশ্বের খনিজ তেল ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনের অন্যতম প্রধান জলপথ। এই দুই সংকটপূর্ণ নৌপথে সামরিক উত্তেজনা ও অবরুদ্ধ অবস্থা বৃদ্ধি পাইলে বিশ্ব অর্থনীতিতে উহার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়িবে। কেননা হরমুজ প্রণালি দিয়া বিশ্বের মোট তৈল ও জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ হইতে ২৫ শতাংশ এবং বাব-আল-মানদেব প্রণালি দিয়া প্রায় ১০ হইতে ১২ শতাংশ বৈশ্বিক বাণিজ্য ও পণ্য পরিবাহিত হয়। এই দুইটি পথ একসঙ্গে বন্ধ হইলে বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ তৈল ও গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হইতে পারে। ইহাতে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তৈলের মূল্য একলাফে বহু গুণ বৃদ্ধি পাইবে। ইহার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়িবে মুদ্রাস্ফীতির উপর, যাহা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার সৃষ্টি করিবে। বিশেষ করিয়া দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিসমূহ এই সংকটে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মতো দেশসমূহ বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরশীল। তৈলের মূল্য বৃদ্ধি পাইলে পরিবহন খরচ ও উৎপাদন ব্যয় হুহু করিয়া বাড়িবে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হইবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নাগালের বাহিরে চলিয়া যাইবে। তাহা ছাড়া ইহাতে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় হ্রাস পাইবে। মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত এই সকল দেশের লক্ষ লক্ষ প্রবাসী শ্রমিকের কর্মসংস্থান পড়িবে হুমকির মুখে।

এই যুদ্ধ যদি আগামী নভেম্বর মাস পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহা হইলে মার্কিন অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও রাজনীতিতেও উহার গভীর আঁচ পড়িবে। যুদ্ধ পরিচালনার বিপুল ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট ঘাটতি আরও বাড়াইয়া দিবে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির দরুন মার্কিন অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি চড়া রূপ ধারণ করিবে, যাহা সাধারণ আমেরিকান ভোটারদের চরম অসন্তুষ্ট করিবে। এই জন্য আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক মন্দা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য বড় বিপদের কারণ হইয়া উঠিতে পারে।

বর্তমানে চলমান কূটনৈতিক ও শান্তিপ্রক্রিয়া যদি কেবল সাময়িক আশ্বাস ও প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহা হইলে যুদ্ধ বন্ধে ইহা সফল হইবে না। কারণ উভয় পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাসের প্রাচীর অত্যন্ত প্রকাণ্ড। একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়িত্বশীল চুক্তি ব্যতিরেকে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত থামানো সম্ভব নহে। এই সংকট হইতে বিশ্বকে রক্ষা করিতে বিশ্বনেতৃবৃন্দের অনতিবিলম্বে ও দৃঢ়ভাবে আগাইয়া আসা উচিত। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশসমূহকে যৌথভাবে কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। এই মুহূর্তে হরমুজ ও বাব-আল-মানদেব প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করিতে আন্তর্জাতিক মনিটরিং সেল গঠন করা প্রয়োজন। সর্বোপরি, বিবদমান সকল পক্ষকে আবার আলোচনার টেবিল আনিয়া নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বার্থের সম্মানজনক সমাধান নিশ্চিত করাই যুদ্ধ বন্ধের একমাত্র পথ। বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে সংঘাত ছাড়িয়া এই রূপ কূটনীতির পথ ধরাই এখন সময়ের প্রধান দাবি।