১৮ জনের মধ্যে ১২ রাষ্ট্রপতিই মেয়াদ শেষ করতে পারেননি

শারীরিক অসুস্থতার কারণ দর্শিয়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে দাঁড়িয়েছেন মো. সাহাবুদ্দিন। শুক্রবার (২৪ জুলাই) জাতীয় সংসদের স্পিকারের নিকট নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার মাধ্যমে পদটির দাপ্তরিক সমাপ্তি টানেন তিনি। দায়িত্ব থেকে বিদায় নেওয়ার পাশাপাশি দেশের প্রায় সাড়ে পাঁচ দশকের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ও অনন্য নজির স্থাপন করে গেছেন সাবেক এই রাষ্ট্রপ্রধান।

বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র রাষ্ট্রপতি, যিনি নিজের একটিমাত্র নির্দিষ্ট মেয়াদকালের মধ্যেই মোট তিনজন পৃথক সরকারপ্রধানের অধীনে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২৩ সালে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর তিনি প্রথমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সময়ও রাষ্ট্রপ্রধানের পদে বহাল ছিলেন। এবং সর্বশেষ সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলেও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব সামলেছেন তিনি।

মো. সাহাবুদ্দিনের এই আকস্মিক পদত্যাগের ঘটনার পর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে একটি প্রশ্ন জোরালো হয়ে উঠেছে—বাংলাদেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত কতজন রাষ্ট্রপতি তাদের নির্ধারিত পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে না পারা ১২ রাষ্ট্রপতি

বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সামরিক অভ্যুত্থান, রাজনৈতিক চরম অস্থিরতা, রাষ্ট্রপ্রধান হত্যাকাণ্ড, তীব্র গণআন্দোলন এবং সাংবিধানিক সংকটের ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপতির পদটি বহুবার চরম অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হয়েছে। স্বাধীন বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ, ভারপ্রাপ্ত কিংবা অস্থায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত মিলিয়ে সর্বমোট ১৮ জন ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির আসন অলঙ্কৃত করেছেন। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, তাদের মধ্যে ১২ জনই তাদের নির্ধারিত মেয়াদের পূর্ণ সময়সীমা শেষ করতে সক্ষম হননি। সর্বশেষ মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করায় অসম্পূর্ণ মেয়াদের এই দীর্ঘ তালিকায় নতুন একটি নাম অন্তর্ভুক্ত হলো।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দূরদর্শী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপ্রধান ঘোষণা করা হলেও, তিনি তৎকালীন পাকিস্তানে কারাবন্দি থাকায় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ১৯৭৩ সালে পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে দায়িত্ব গ্রহণ করা মোহাম্মদউল্লাহর মেয়াদকাল বাকশাল প্রবর্তনের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে দেশের রাজনীতি এক কলঙ্কজনক অধ্যায়ে প্রবেশ করে। এরপর ক্ষমতায় বসা খন্দকার মোশতাক আহমেদ মাত্র ৮১ দিনের মাথায় ক্ষমতাচ্যুত হন। তার পরবর্তীতে আসা বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমও দেশের তৎকালীন সামরিক বাস্তবতার মুখে পড়ে ১৯৭৭ সালে পদত্যাগে বাধ্য হন। এরপর রাষ্ট্রপতি পদ সামলানো জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক নৃশংস সামরিক অভ্যুত্থানে প্রাণ হারান।

জিয়াউর রহমানের আকস্মিক প্রয়াণের পর নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া আবদুস সাত্তার ১৯৮২ সালে তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানে গদি হারান। পরবর্তীতে এরশাদের মনোনীত রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আহসানউদ্দিন চৌধুরীও নিজের পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে সমর্থ হননি। এরপর এরশাদ নিজেই রাষ্ট্রপতির চেয়ার দখল করলেও ১৯৯০ সালের তীব্র ও ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

৯০-এর গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশ পুনরায় সংসদীয় গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে এলে অধিকাংশ রাষ্ট্রপতিই তাঁদের মেয়াদ সফলভাবে পূর্ণ করতে পেরেছেন। তবে এই সময়েও কয়েকটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটেছে। ২০০১ সালে রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হওয়া চিকিৎসক ও রাজনীতিবিদ এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী দলীয় কোন্দল ও রাজ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় মাত্র সাত মাসের মাথায় পদত্যাগ করেন। অন্যদিকে ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেওয়া প্রবীণ রাজনীতিবিদ জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন অবস্থায় ২০১৩ সালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করায় তাঁর মেয়াদ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহমেদের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলেও পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করে গিয়েছিলেন।

সর্বশেষ ২০২৩ সালে বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী তাঁর এই মেয়াদের মেয়াদকাল ২০২৮ সাল পর্যন্ত বহাল থাকার কথা ছিল। তবে পরিবর্তিত দেশের রাজনৈতিক চালচিত্র ও ব্যক্তিগত শারীরিক অসুস্থতার কারণ তুলে ধরে তিনি আগাম পদত্যাগ করলেন। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে না পারা বারো নম্বর রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে যুক্ত হলো মো. সাহাবুদ্দিনের নাম।