সরকার যদি জুলাই বিপ্লবের সংস্কার পরিকল্পনা ও গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করে, তবে আগামী পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, তারেক রহমানকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তিনি কি পাঁচ বছর নির্বাচিতভাবে ক্ষমতায় থাকতে চান নাকি শেখ হাসিনাসহ পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় যেই করুণ পরিণতি হচ্ছে জনগণের রায়কে অবজ্ঞা করার জন্য সেই পরিণতি তিনি ভোগ করতে চান।
শনিবার (২৫ জুলাই) বিকেলে সিলেট আলিয়া মাদরাসা মাঠে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই গণহত্যায় জড়িত শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের বিচারের দাবিতে সিলেট বিভাগীয় সমাবেশ সিলেটে বিভাগীয় এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
সমাবেশে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও ছাত্র-তরুণদের কথা উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, আমরা মনে করি দেশ থেকে দেশে এই যে তরুণদের উত্থান, তরুণরা জেগে উঠছে, রাজপথে অন্যায় বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলছে- এটা জুলাই বিপ্লবের ধারাবাহিকতা। আমরা বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে জুলাই বিপ্লবীদের পক্ষ থেকে ভারতের আন্দোলনরত ছাত্র-তরুণদেরকে সাধুবাদ জানাই।
ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ায় চলমান তরুণদের প্রতিবাদের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, বিশ্বজুড়ে তরুণদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া জুলাই বিপ্লবেরই ধারাবাহিকতা। যখন বিশ্বের অন্যান্য দেশ তরুণ ও গণদাবিকে সম্মান জানাচ্ছে, তখন বাংলাদেশের নতুন সরকার উল্টো পথে হেঁটে।
তিনি বলেন, যেই দেশে জুলাই বিপ্লবের ফলে সরকার পতন হয়েছিল এবং নির্বাচনের পরবর্তীতে যে সরকার এসেছে আমরা আশা করেছিলাম এই নতুন সরকার জনরায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে। ছাত্র-তরুণদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে। কিন্তু আমরা দেখলাম যে জনগণের রায়কে তারা ক্ষমতায় এসেই অবজ্ঞা করা শুরু করেছে। ৭০ শতাংশ জনগণ গণভোটে যে গণরায় দিয়েছে সংস্কারের পক্ষে, জুলাই সনদের পক্ষে, সেই রায়কে তারা অবজ্ঞা করছে।
আমরা দেখলাম এই দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপি- তারা নিজের দলের ভেতর কোনো সংস্কার আনলো না এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের জন্য যে ন্যূনতম ঐকমত্য সেই ঐকমত্য মেনে নিল না। যদি তারা এই পথে হাঁটে, তারা জুলাই বিপ্লবকে ভুলে যায়, যদি তারা ছাত্র-তরুণদের আন্দোলনকে ভুলে যায়, যদি এদেশের ১৪০০ মানুষের আত্মত্যাগকে ভুলে যায়, তাহলে তার পরিণতি বিএনপির তারেক রহমানের সরকারকেই ভোগ করতে হবে।
সংবিধান প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, সংস্কার বনাম সংশোধন এই বিতর্ক নতুন করে শুরু হয়েছে এই দেশে। আমরা মনে করি এই বিতর্কের কোনো প্রয়োজন ছিল না। আমরা ঐকমত্য কমিশনেই এই বিতর্কের অবসান করেছিলাম যে, দেশে সংশোধনের মাধ্যমে দেশের সংবিধানের কোনো মৌলিক কাঠামোর পরিবর্তন সম্ভব হবে না। দেশের কোনো মৌলিক সংস্কার সম্ভব হবে না। ফলে আমাদের লাগবে সংস্কার পরিষদ অথবা গণপরিষদ। সেই সময় বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদ এবং গণভোটে রাজি হলো। নির্বাচিত হওয়ার পরে তারা সংস্কার কী সেটা ভুলে গিয়েছে। তাদের ২১ দফাতে সংবিধান সংস্কার কমিশনের কথা উল্লেখ থাকলেও নির্বাচিত হওয়ার পরেও সংস্কার কী তারা ভুলে গিয়েছে। তারা এখন শুধু সংশোধন চিনে আর কিছু চিনে না। বিএনপি সমর্থিত কিছু দালাল বুদ্ধিজীবী তারাও প্রচার করছে দেশে সংশোধন প্রয়োজন সংস্কার প্রয়োজন নেই। কিন্তু দেশের মানুষ সংস্কারের জন্যই জীবন দিয়েছে। এই বিএনপি গত ১৬ বছর ধরে সংস্কারের মুলা ঝুলিয়ে, ৩১ দফার মুলা ঝুলিয়ে জনগণের সাথে প্রতারণা করেছে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও সমালোচনা করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, রাজধানীতে গ্যাস সংকট, জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও এলপিজির দাম বৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে মানুষ চাপে রয়েছে। পাশাপাশি বাজেটের মাধ্যমে মধ্যবিত্তের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার দাবি, সংস্কার না হওয়ায় সরকার আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও যথাযথভাবে পাচ্ছে না। ফলে সরকার যদি সংস্কার না করে, সরকার যদি বিচার না করে, জনগণের মধ্যে যে নতুন আস্থা তৈরি হয়েছিল সেই আস্থা তারেক রহমানের সরকার ধরে রাখতে পারবে না।
নির্বাচন কমিশন নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি অভিযোগ করেন, সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করছে। তার মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের সংস্কার ও পুনর্গঠন করতে হবে, অন্যথায় বর্তমান কমিশনারদের পদত্যাগ করা উচিত।
সমাবেশে নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হলে বর্তমান সরকারকে আর সমর্থন দেওয়া সম্ভব হবে না। ফলে আমরা আশা করবো সিলেটবাসী যেভাবে জুলাই বিপ্লবে রক্ত দিয়ে দেশের গণতন্ত্র এবং সার্বভৌমত্বের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন, আবারো সংস্কারের পক্ষে গণরায়ের পক্ষে আপনারা দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলবেন ইনশাআল্লাহ। দেশের রাজনীতির পক্ষে সার্বভৌমত্ব, সংস্কার এবং সুশাসনের পক্ষে আমরা ১১ দল ঐক্যবদ্ধ আছি, ঐক্যবদ্ধ থাকবো।