গাজীপুরের শ্রীপুরে এক যুবককে বাজার থেকে তুলে নিয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় রাতভর পাশবিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে শ্রমিকদল নেতা ও তার দলবলের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী যুবকেরপরিবারের অভিযোগ, দাবি করা চাঁদা না দেওয়ায় গ্যাসের চুলায় লোহার রড গরম করে শরীরের কমপক্ষে ১০০ স্থানে দেওয়া হয়েছে ছ্যাঁকা। গুরুতর আহত যুবক পুলিশ হেফাজতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, শুধু তাই নয়। রাতভর নির্যাতনের পর হাত-পা কোমড় ভেঙে আওয়ামী লীগ নেতা ও হত্যা মামলার আসামি বলে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। মারাত্মক গুরুতর আহত যুবককে আদালতে নিয়ে গেলেও গুরুতর আঘাতের কারণে আদালত তাকে গ্রহণ করেনি।
ভুক্তভোগী যুবক সজীব মিয়া (৩০) উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের টেপিরবাড়ি দেওচালা গ্রামের মো. কফিল উদ্দিনের ছেলে।
অভিযুক্ত ব্যক্তি মো. শরিফ সরকার (৪৩) উপজেলার মাওনা ইউনিয়নের মাওনা গ্রামের মৃত আবুল হোসেন সরকারের ছেলে। তিনি জেলা শ্রমিকদলের আহবায়ক কমিটির সদস্য।
নির্যাতনের শিকার সজীব মিয়ার বাবা কফিল উদ্দিন জানান, গত ২১ জুলাই রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে স্থানীয় শ্রমিকদল নেতা তার লোকজন এমসি বাজারে অবস্থিত আমার ছেলের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। আমার ছেলে চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা ওখানেই লোহার রড লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে শ্রমিকদল নেতার প্রাইভেটকারে তুলে নিয়ে যায় স্বপ্নপুরী হোটেল সংলগ্ন শ্রমিকদল নেতার বাড়ির নিচে টর্চার সেলে। সেখানে নিয়ে রাতভর তার উপর চালায় নির্যাতন। রাত ১২ টার দিকে খবর পেয়ে ছেলেকে খুঁজতে বের হলে। লোকজনের মারফতে জানতে পারি শ্রমিকদল নেতা ও তার লোকজন ধরে নিয়ে গেছে। পরে নির্যাতনকারীর অফিসসহ কয়েকটি স্থানে খোঁজ না পেয়ে সর্বশেষ স্বপ্ন পুরী হোটেলের পেছনে ছেলেকে তাদের হাতে নির্যাতন করা অবস্থায় দেখতে পাই। তাকে রক্ষা করতে আমার ভাইয়ের ছেলে আনিছ এগিয়ে গেলে তাকেও মারধর করে আহত করা হয়।
কফিল উদ্দিন অভিযোগ করে আরও বলেন, তারা আমার ছেলেকে না ছেড়ে দিয়ে রাতভর নির্যাতন চালায়। ভোররাতে পুলিশকে খবর দিয়ে আওয়ামিলীগ নেতা বলে এবং তাকে হত্যা মামলার আসামির পরিচয় দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। কিন্তু আমার ছেলে কোনো রাজনীতি করে না। তবে সে এক আওয়ামী লীগ নেতার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেখভাল করে। পুলিশ পাহারায় ছেলেকে শ্রীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তার অবস্থা আশঙ্কা দেখে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে তার চিকিৎসা চলছে।
ভুক্তভোগী যুবকের মা খালেদা আক্তার বলেন,
ছেলের শরীরের এক ইঞ্চি জায়গা বাকি নেই আঘাত করা ছাড়া। শরীরের ১০০ স্থানে লোহার রড গরম করে ছ্যাঁকা দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। হাত-পা কোমর ভেঙে দিয়েছে। খুবই অবস্থা খারাপ। আল্লাহ তায়ালা... যদি ছেলেকে রেখে যায়, ওদের হুমকির কারণে তাৎক্ষণিক থানায় লিখিত অভিযোগ পর্যন্ত দিতে পারিনি।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শ্রমিকদল নেতা শরীফ সরকার বলেন, সজীব বৈষম্যবিরোধী হত্যা মামলার আসামি। বিএনপির নেতাকর্মীরা তাকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে। মারধরের বিষয়টি বলতে পারবো না আমরা তাকে মারিনি, পুলিশ কি করেছে জানি না।
শ্রীপুর থানার এসআই অরুপ কুমার বলেন, রাত্রিকালীন ডিউটিতে থাকা অবস্থায় থানা থেকে খবর পেয়ে এমসি বাজার এলাকা থেকে গুরুতর আহত অবস্থায় একজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাই। এর পরবর্তী কার্যক্রমের বিষয়ে থানার এসআই মাজাহারুল ইসলাম ভালো বলতে পারবেন।
শ্রীপুর থানার উপপরিদর্শক এসআই মাজাহারুল ইসলাম বলেন, আটক সজিবকে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে বৃহস্পতিবার আদালতে নেওয়া হলে বিচারক অসুস্থতার কারণে গ্রহণ না করে চিকিৎসার জন্য পুলিশ হেফাজতে পাঠিয়ে দেন। বর্তমানে তার চিকিৎসা চলছে।
শ্রীপুর থানার ওসি মোহাম্মদ শাহীনুর আলম বলেন, সজীবকে সেখানে কঠিন মারধর করা হয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসা চলমান। বিষয়টি আদালতের নলেজে রয়েছে। সজীব বৈষম্যবিরোধী হত্যা মামলার আসামি এটা ঠিক। কিন্তু এই কারণে তাকে মারধর করা ঠিক হয়নি।
তিনি আরও জানান, মারধরের ঘটনায় আহত সজীবের মা বাদী হয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। লিখিত আবেদনের প্রেক্ষিতে তদন্ত চলমান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা শ্রমিকদলের সদস্যসচিব আবুল কালাম প্রধান বলেন, তার বিরুদ্ধে বিতর্কিত ঘটনার অনেক অভিযোগ আছে। ব্যক্তির দায় কখনও দল নেবে না। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।