ভারতের ককরোচদের আন্দোলনের প্রশংসায় পাকিস্তানিরা

‘পাকিস্তানে এক প্লেট বিরিয়ানির জন্য বিক্রি হয়ে যায় মানুষ’

ভারতের জেন-জি বা নতুন প্রজন্মকে এতদিন এমন একটি প্রজন্ম হিসেবে দেখা হতো, যারা অধিকাংশ সময় স্মার্টফোনে ব্যস্ত থাকে, মনোযোগের ঘাটতিতে ভোগে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক জীবনযাপন করে। তবে সাম্প্রতিক এক মাসে সেই প্রচলিত ধারণার বিপরীতে ভিন্ন এক চিত্র তুলে ধরেছে দেশের তরুণরা।

নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে টানা আন্দোলন ও বিক্ষোভের মুখে সরকারকে একাধিক পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন।

এই আন্দোলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এর ডিজিটাল সংগঠন। প্রচলিত রাজনৈতিক ইশতেহারের বদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মিম, ইনস্টাগ্রাম রিলস এবং স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও কর্মীদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি, বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ নথিবদ্ধ করার মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। আন্দোলনের প্রভাব ভারতের গণ্ডি পেরিয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর তরুণদের মধ্যেও আলোচনার জন্ম দেয়। 

জেন জি প্রজন্মের মনোযোগ স্বল্পস্থায়ী বলে মনে করা হয়। তবে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নেপালের মতো প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে যে বিপুল সমর্থন পেয়েছে ভারতের জেন-জি আন্দোলনকারীরা; তা ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভের প্রভাবের কথাই বলে দেয়। সাম্প্রতিক অতীতে এসব দেশেও জেন জি বিক্ষোভ দেখা গেছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির কাছে ভারতের জেন-জি বিক্ষোভ নিয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে পাকিস্তানি এক তরুণী বলেন, ‌‌‘‘কহিন পেয়ার না হো যায়ে...ইতনা আছা করোগে তো আমি নফরাত কইসে করেঙ্গে।’’ অর্থাৎ তোমরা যদি এত দারুণ কাজ করো, তাহলে আমি তোমাদের ঘৃণা করব কীভাবে?’’ সীমান্তে বিভাজিত হলেও জেন জির জোয়ারে এখন সবাই একসূত্রে গাঁথা।

ভারতের জেন-জিদের প্রশংসায় শ্রীলঙ্কা-নেপাল

শ্রীলঙ্কা ও নেপাল থেকেও ভারতের আন্দোলনকারী জেন-জিদের প্রতি ভালোবাসা ও বিস্ময় প্রকাশ করা হয়েছে। ২০২২ সালে অর্থনৈতিক সংকটের জেরে রাজাপাকসে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার স্মৃতি এখনও শ্রীলঙ্কার তরুণদের মনে টাটকা রয়েছে। তাই ভারতের এই আন্দোলনের রেশ পাওয়া গেছে শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক কার্টুন ও ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতেও। শ্রীলঙ্কান কার্টুনিস্ট অবান্থা আরটিগালা তার এক কার্টুনে দেখিয়েছেন, ভারতের সরকার কীভাবে ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকাসম আন্দোলনকারীদের সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।

এছাড়া, আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী ছবি হয়ে উঠেছে মুম্বাইয়ের তরুণী রিও আহিরের একটি স্থিরচিত্র। যেখানে পুলিশের প্রিজন ভ্যানের গতি রোধ করতে তার এক হাত ছিল গাড়ির ওপর। অনেকেই এর সঙ্গে ১৯৮৯ সালের চীনের তিয়েনআনমেন স্কয়ারের ঐতিহাসিক ‘ট্যাংক ম্যানের’ ছবির তুলনা করছেন।

নেপালও ভারতের এই জেন জি যোদ্ধাদের সমর্থনে এগিয়ে এসেছে। কাঠমান্ডুর কনটেন্ট ক্রিয়েটর অবিনাশ মিশ্র বলেন, আন্দোলনকারীদের রাগ ও অনুভূতি শতভাগ যৌক্তিক। ২০২৫ সালে নেপালে জেন জি আন্দোলনের স্মৃতি টেনে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, তোমরা যা অনুভব করছ তা সঠিক, লড়াইয়ের লক্ষ্য যেন কখনো হারিয়ে না যায়।

পাকিস্তান থেকে ভালোবাসার জোয়ার

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক প্রতিক্রিয়া এসেছে পাকিস্তান থেকে। সাধারণত ভারতের প্রতি যেখানে শত্রুতার আবহ থাকে, সেখানে এবার দেখা গেছে অকপট প্রশংসা।

পাকিস্তানে মুক্তচিন্তা বা সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু দেশটির নাগরিকরা ভারতের এই ‘ককরোচ’ আন্দোলনকারীদের প্রেমে পড়েছেন। এক পাকিস্তানি তরুণ বলেন, ‘সুযোগ পেলে আমাদেরও এভাবে রাস্তায় নামা উচিত। ককরোচ জনতা পার্টি সত্যিই দারুণ। তারা খুব বেশি ভাবগাম্ভীর্য দেখায়নি, তাদের এই ব্যাপারটা আমার দারুণ লেগেছে।’

দেশটির অপর এক তরুণ বলেন, মুম্বাইয়ে সাধারণ একজন পথচারী পুলিশের ভ্যানের ছিটকিনি খুলে আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের যেভাবে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন, তা দেখে আমি মুগ্ধ। তিনি পাকিস্তানি তরুণদের ভারতের শিক্ষার্থীদের থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ঐক্য। হিন্দু-মুসলিম বা জাতিগত বিভেদ ভুলে তারা এক হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানে পাঞ্জাবি, পশতুন, সুন্নি, শিয়া বিভেদের কারণে আমাদের পক্ষে এভাবে এক হওয়া কঠিন।

আন্দোলনে বিদেশি বা পাকিস্তানি অর্থায়নের অভিযোগ প্রসঙ্গে পাকিস্তানি কনটেন্ট ক্রিয়েটর বিলাল হাসান ব্যাঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে বলেন, মানুষ বলছে পাকিস্তান নাকি এতে অর্থায়ন করেছে! আমাদের নিজেদের দেশ চালানোর টাকা নেই, আমরা আবার তাদের টাকা দেব কীভাবে?

তিনি বলেন, ভারতে শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করছে, আর আমাদের দেশে মানুষকেই গায়েব করে দেওয়া হয়। যদি আপনি বেলুচ হন, তাহলে মানুষটি বেঁচে আছে না মরে গেছে তাও জানা যাবে না। আমাদের এখানে মানুষ এক প্লেট বিরিয়ানির জন্য বিক্রি হয়ে যায়।

বিলাল হাসান দুই দেশের এই আত্মিক সম্পর্ককে এক বাক্যে প্রকাশ করে বলেন, দিনশেষে আমরা একে অপরকে বুঝি। কারণ আমরা তো একই বিচ্ছেদের (দেশভাগ) সন্তান।

রাজধানী দিল্লিতে সিজেপির প্রতিবাদ যখন তুঙ্গে উঠেছিল, তখন চারপাশের দৃশ্য ছিল নজিরবিহীন। বিশ্ব আর ভারতের তরুণদের ভিডিও, মিম বা স্লোগান দেখে হাসেনি; বরং শ্রদ্ধার সঙ্গে তা প্রত্যক্ষ করেছে।

সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে