বাধ্যতামূলক শ্রম নিষিদ্ধের আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ না করার অভিযোগে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন। ২৪ জুলাই শুক্রবার থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই সিদ্ধান্তে দেশভেদে ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বসানো হচ্ছে। মূলত একটি অস্থায়ী বৈশ্বিক শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক পরপরই হোয়াইট হাউজ এই পদক্ষেপ নিল। ২৩ জুলাই দেশটির 'ফেডারেল রেজিস্টার'-এ প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে নতুন এই শুল্কের তথ্য জানানো হয়। নতুন এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রের মোট আমদানির ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ পণ্যকে প্রভাবিত করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া ও মেক্সিকোসহ বেশ কয়েকটি দেশের পণ্যে ১০ শতাংশ শুল্ক বসানো হবে। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও সুইজারল্যান্ডের পণ্যে পূর্বনির্ধারিত শুল্কের সঙ্গে সমন্বয় করে মোট ১০ বা সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক ধার্য করা হবে। এছাড়া চীনসহ বাকি ৩৮টি দেশকে সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্কের আওতায় আনা হয়েছে।
হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, ১৯৭৪ সালের ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ৩০১-এর আওতায় এই শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট জাতীয় জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে ট্রাম্পের আরোপ করা তথাকথিত 'পারস্পরিক শুল্ক' (রিসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ) বাতিল করে দেওয়ার পর প্রশাসন নতুন আইনি ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত ১০ শতাংশ শুল্ক পূর্বে নির্ধারিত শুল্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রায় ২৫.৬২ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপে তাৎক্ষণিক ক্ষোভপ্রকাশ করেছে বেশ কয়েকটি দেশ। নরওয়ে, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল এই নতুন শুল্ক আরোপকে 'অন্যায্য' ও 'অযৌক্তিক' আখ্যা দিয়ে এটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। মাত্র কয়েক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কের মুখে পড়া কানাডা কিছুটা নমনীয় প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে পারস্পরিক স্বার্থে আগামী সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে ব্যক্ত করেছে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিকে খুব একটা নেতিবাচক হিসেবে দেখছে না। বরং নতুন শুল্ক আরোপের ফলে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পোশাক রপ্তানিকারক দেশ চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের তুলনায় মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা আরো বাড়বে বলে আত্মতৃপ্তি লাভ করছে। গত ২৪ জুলাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নতুন শুল্কনীতি ঘোষণার অব্যবহিত
পরই আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করে। তাতে স্পষ্টভাবেই এই নতুন শুল্ক আরোপকে স্বাগত জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, 'বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পোশাক রপ্তানিকারক দেশ চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডকে সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্কস্তরে রাখা
হয়েছে। ফলে এসব দেশের তুলনায় মার্কিন বাজারে বাংলাদেশের তুলনামূলক সুবিধা আরো বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।' কিন্তু সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়ার সুযোগ খুবই কম। বরং বলা যায়, এই নতুন শুল্ক আরোপের ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা প্রকট হবে।
প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একক বৃহত্তম রপ্তানি বাজার, আর তৈরি পোশাক দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি জোগান দেয়। এই খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত কয়েক কোটি মানুষের জীবিকা। নতুন শুল্ক বৃদ্ধির ফলে মার্কিন ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশি পণ্যের দামও বাড়বে, যা প্রকারান্তরে বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দেবে। দ্বিতীয়ত ভিয়েতনাম, চীন ও থাইল্যান্ডের মতো প্রধান
নতুন আরোপিত মার্কিন শুল্কনীতির কারণে স্বল্প মেয়াদে বাংলাদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় কিছুটা স্বস্তিতে থাকলেও, সামগ্রিকভাবে এই শুল্ক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক চাপ তৈরি করবে
প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে আপেক্ষিক প্রতিযোগিতায় সামান্য এগিয়ে থাকলেও নতুন শুল্ক আরোপের ফলে ভারতের সঙ্গে কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে। বাংলাদেশে ২০২৪-এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের একটি বড় অংশই তাদের সোর্সিং ভারতমুখী করার প্রয়াস পায়। এতে আমাদের পোশাকশিল্প বড় রকমের এক চ্যালেঞ্জের মুখে পতিত হয়, যার রেশ এখনো চলছে। মার্কিন নতুন শুল্ক আরোপ সেই চ্যালেঞ্জকে আরো কঠিনতর করে তুলতে পারে। তৃতীয়ত, নতুন মার্কিন শুল্কনীতির ফলে সামষ্টিক অর্থনীতির ওপরও চাপ বাড়বে। রপ্তানি আয় কমলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, টাকার বিনিময় হার এবং চলতি হিসাবের ভারসাম্যে চাপ পড়বে। অনেকেই মনে করেন, এ ধরনের শুল্ক বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য আইএমএফ ঋণ কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন করে তুলবে, এমনকি ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়েও নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরে বর্তমানে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ, যেমন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানিসংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কারখানার কাঁচামালের জন্য অতিরিক্ত মাত্রায় আমদাননির্ভরতা, এসব নতুন শুল্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল করে তুলতে পারে।
এদিকে এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণের পথে থাকা বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে ওঠার কথা। তা ঘটলে বিদ্যমান শুল্ক ও কোটাসুবিধা হারানোর ঝুঁকি এমনিতেই ছিল। নতুন মার্কিন শুল্ক সেই উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জকে আরো তীব্র করে তুলবে। বলার অপেক্ষা রাখে না, রপ্তানি আদেশ কমলে বা ক্রেতারা বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকলে, ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার প্রভাব পড়বে লাখো শ্রমিকের আয় ও চাকরির নিরাপত্তায়। বিষয়টির একটি রাজনৈতিক দিকও রয়েছে।
কে না জানে, অর্থনৈতিক চাপ প্রায়ই রাজনৈতিক অস্থিরতায় রূপ নেয়, বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যার আশঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কূটনৈতিকভাবে, সরকার ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে 'অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড' স্বাক্ষর করেছে এবং শ্রম মানসংক্রান্ত অঙ্গীকার দিয়েছে, যার সুবাদে বাংলাদেশ সর্বনিম্ন শুল্কবন্ধনিতে জায়গা পেয়েছে। কিন্তু এই চুক্তি নিয়েও রয়েছে নানামুখী সমালোচনা। সেসবকে অগ্রাহ্য করে সরকার যুক্তরাষ্ট্রকে 'ঘনিষ্ঠ বন্ধু' হিসেবে অভিহিত করে সম্পর্ক অটুট রাখার বার্তা দিচ্ছে। তবে এই ধরনের অসম বাণিজ্য নীতিনির্ভরতা রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর, কারণ যে কোনো আপসকে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি বা শ্রমিকসংগঠনগুলো 'জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন' হিসেবে তুলে ধরতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নতুন আরোপিত শুল্কের ফলে পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর ওপর চাপ বাড়বে; কারখানা বন্ধ বা ছাঁটাইয়ের ঝুঁকি তৈরি হলে শ্রম অসন্তোষ ও আন্দোলনের সম্ভাবনাও বাড়তে পারে, যা রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরো ঘনীভূত করতে পারে। একই সঙ্গে সরকারকে অভ্যন্তরীণভাবে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের কাছে প্রণোদনা, করসুবিধা বা নীতিসহায়তা দেওয়ার দাবির মুখোমুখি হতে হবে, যা রাজস্ব ঘাটতির মধ্যে নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করবে।
পরিশেষে বলা যায়, নতুন আরোপিত মার্কিন শুল্কনীতির কারণে স্বল্প মেয়াদে বাংলাদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় কিছুটা স্বস্তিতে থাকলেও, সামগ্রিকভাবে এই শুল্ক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক চাপ তৈরি করবে, যা চূড়ান্ত পর্যায়ে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকে ধীর করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে অনিশ্চয়তা বাড়াবে এবং কর্মসংস্থানের ঝুঁকি তৈরি করে দিতে পারে। দেখার বিষয়-সরকার কীভাবে পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করে।
লেখক: সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলামিস্ট