কিশোরগঞ্জের ভৈরবে বাজারের নামকরণ নিয়ে দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষে মাসুদ মিয়া (৩০) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় উভয়পক্ষের প্রায় অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের কারণে ভৈরব রেলস্টেশনে আটকা পড়েছে ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জগামী এগারসিন্দুর প্রভাতী ট্রেন।
সোমবার (২৭ জুলাই) সকাল ৮টা থেকে ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক সড়ক দখল করে এই সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় ভৈরব ও কুলিয়ারচর থানা পুলিশ সদস্যরা।
সংঘর্ষের কারণে আঞ্চলিক সড়কে এক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে ও ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে।তাছাড়া সংঘর্ষে টেঁটাবিদ্ধ হয়ে মিরারচর গ্রামের মাসুদ মিয়া (৩৭) নামের একজন নিহত হয়েছে।
এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন ভৈরব সার্কেল সহকারী পুলিশ সুপার আবু মুছা শেখ।
স্থানীয়রা জানান, এর আগে ২৬ জুলাই স্থানীয় এমপি এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম দুই গ্রামের নেতৃবৃন্দদের সঙ্গে নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করেন। এসময় তিনি দুই গ্রামের ১০ জনকে নিয়ে একটি সমন্বয় কমিটি করেন। তিনদিনের মধ্যে সমস্যা সমাধানে আশ্বাস দেন তিনি। প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া আশ্বাসের ২৪ ঘণ্টা যেতে না যেতেই সকাল ৮টায় ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক সড়কে দুই পাশে দুই গ্রাম হওয়ায় মহাসড়ক অবরোধ করে দুই গ্রামের মানুষ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
পুলিশের হস্তক্ষেপে এক ঘণ্টা পর সড়ক থেকে সংঘর্ষ সরিয়ে নিলেও পরে আবারও গ্রামের ভেতর সংঘর্ষে জড়ায় দুইপক্ষ। এসময় উভয়পক্ষ ভৈরব ময়মনসিংহ রেলপথে দখল করে।
এ সংঘর্ষ চলাকালে দুপক্ষের অর্ধশতাধিক মানুষ আহতের খবর পাওয়া গেছে। আহতদের মধ্যে ১৮ জন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এলাকাবাসী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ৪৫ বছর ধরে কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আকবর নগর ও মিরারচর গ্রামের মানুষদের মধ্যে বাসস্ট্যান্ড এলাকার নামকরণ বিরোধ চলছিল। আকবর নগর গ্রামের মানুষ বাসস্ট্যান্ড এলাকাটিকে আকবর নগর বাসস্ট্যান্ড ও বাজার বলে দাবি করে। অপরদিকে মিরারচর গ্রামের মানুষ বাসস্ট্যান্ডের বাজারটি মিরারচরের বাসস্ট্যান্ড বলে দাবি করে। এই নিয়ে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে অনেকবার। গত ১৫ বছরে ৩ বার একইভাবে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় দুই গ্রামবাসী। সংঘর্ষের পর ভৈরব থানায় দুই গ্রামবাসীকে নিয়ে সালিশ দরবার হলেও সমাধান হয়নি। সালিশে সিদ্ধান্ত হয় এ বাসস্ট্যান্ডকে ‘মিরারচর’ ও ‘আকবরনগর’ বাসস্ট্যান্ড বলা হবে। এছাড়া গত ১০ বছর আগে আকবরনগর বাসস্ট্যান্ড বাজার কমিটি সিদ্ধান্ত নেই তাদের ব্যবহৃত যে কোনো ক্যাশমেমো ও সাইনবোর্ডে আকবর নগর মিরারচর এক সঙ্গে লিখে ব্যবহার করতে হবে। পরবর্তীতে কেউ তা মানলেও কেউ কেউ মানছে না।
প্রায় ৩ বছর আগে জুলাই মাসে সড়ক ও পরিবহন বিভাগ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় একটি পরিচিতি সাইনবোর্ড স্থাপন করে। সাইনবোর্ডে লেখা ছিল শুধু আকবরনগর বাজার। এই লেখা দেখেই ফুঁসে ওঠে মিরারচর এলাকাবাসী। পরে মিরারচর এলাকার কিছু লোক আকবনগর লেখা সাইনবোর্ডটি উপড়ে ফেলে দিতে গেলে আকবরনগর গ্রামের মানুষ তা বাধা দিতেই সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়।
আকবরনগর গ্রামের রবিন সওদাগর ও জাহানারা আক্তার বলেন, আমাদের বাজারের উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিমে আকবরনগর গ্রামের অংশ। এমনকি বাজারটি আকবরনগর মৌজায় রয়েছে। বাজারে মিরারচরের মানুষের কোনো অংশ নাই। আমাদের বাজার মিরারচরের নামে হতে আমরা দিবো না।
মিরারচর গ্রামের শফিকুল ইসলাম ও আমিন মিয়া বলেন, জন্মলগ্ন থেকেই আমরা আমাদের বাজারকে মিরারচর বাজার হিসেবে জানি। এমনকি মানুষ বাসস্ট্যান্ডকে মিরারচর বাসস্ট্যান্ড হিসেবে চেনে। আমরা বেঁচে থাকলে মিরারচর বাজারকে এককভাবে আকবরনগর বাজার হিসেবে মেনে নিব না। ভৈরবের নেতৃবৃন্দ বারবার ব্যর্থ হয়েছে। ৪৫ বছরেও এর কোনো সমাধান দিতে পারেনি।
কালিকাপ্রসাদ ইউপি চেয়ারম্যান মো. লিটন মিয়া বলেন, দীর্ঘদিন যাবত আকবর নগর ও মিরারচর বাসস্ট্যান্ড বাজারকে নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে। মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ভৈরবে ২৬ জুলাই এসে নামকরণের সমাধানের জন্য মিটিং করেছিলেন। দুই গ্রামের মানুষদের তিনদিনের ভিতর সমাধানের আশ্বাসও দিয়েছিলেন। ২৭ জুলাই হঠাৎ সকাল থেকে দুই গ্রামের মানুষ সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। আজকের এই সংঘর্ষের বিষয়ে কোনো গ্রামের মানুষই আমাদেরকে অবগত করেনি। দুই গ্রামের মানুষ সমাধানের সুযোগ না দিয়েই তারা সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছে।
ভৈরব সার্কেল সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার আবু মুছা শেখ বলেন, বাজারে নামকরণকে কেন্দ্র করে আকবর নগর ও মিরারচর গ্রামের লোকদের সংঘর্ষ হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চেষ্টা করি। কিশোরগঞ্জ থেকে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স এনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা চলছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী সংঘর্ষে একজনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে।