ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি

চোখের সামনেই কাতরাচ্ছিলেন স্বজন, হাসপাতালে নিলেও মেলেনি চিকিৎসা

‘চোখের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে কাতরাচ্ছিলেন স্বজন। বাঁচানোর আশায় নেওয়া হয় হাসপাতালে। কিন্তু মুমূর্ষু অবস্থায়ও মেলেনি কোনো চিকিৎসা। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা ছাড়াই মারা যান তিনি।’ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্যে নিজের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া সেই বিভীষিকাময় ঘটনার বর্ণনা দেন এনআরবি মামুন।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১–এর সদস্য বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। নারায়ণগঞ্জে ১০ জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দুই নম্বর সাক্ষী হিসেবে তিনি আদালতে সাক্ষ্য দেন।

৪১ বছর বয়সী মামুনের বাড়ি নারায়ণগঞ্জে। তিনি ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের ব্যবসা করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।

সাক্ষ্যে মামুন বলেন, ২০২৪ সালে কোটাবিরোধী আন্দোলন শুরু হওয়ার পর ১২ জুলাই থেকে আমরা আন্দোলনে যোগ দেই। ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদ হত্যার পর নারায়ণগঞ্জে আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। ১৯ জুলাই সহযোদ্ধাদের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের জালকুড়ি এলাকায় অবস্থান নেই আমি। ওই দিন বিকেল ৩টার দিকে আমাদের ওপর সশস্ত্র হামলা চালান তৎকালীন নারায়ণগঞ্জের এমপি শামিম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমানসহ প্রায় ১০০ জন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। এতে অনেকেই আহত হন। আমি নিজেও গুলিবিদ্ধ হই। এ ছাড়া, আমার পাশে থাকা আদিল ও ইয়াসিন গুলিতে ঘটনাস্থলেই মারা যান।

তিনি বলেন, শামীম ওসমানের লোকজনই আমাদের গুলি করেছিলেন। আহত হওয়ায় সঙ্গে থাকা লোকজন মিলে আমাকে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য চিকিৎসকের কাছে নেন। একদিন বিশ্রামে থাকার পর ২১ জুলাই পুনরায় আন্দোলনে অংশ নেই। ওই দিন নারায়ণগঞ্জের জন্য একটি ভয়াবহ দিন ছিল। বেলা ১১টার দিকে আমি লোকজন নিয়ে সাইনবোর্ড থেকে চিটাগং রোডের দিকে যাচ্ছিলাম। একপর্যায়ে মা হাসপাতালের সামনে অবস্থান নেই। ওই সময় বাজারের গলি থেকে শামীম ওসমান, শাহ নিজাম, ফাইজুল ইসলাম, কমিশনার রুহুলসহ প্রায় ১৫০ জন লোক আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালান। তাদের প্রত্যেকের হাতে দেশি-বিদেশি অস্ত্র ছিল। হামলা থেকে বাঁচতে দৌড়ে পালাতে গিয়ে আমি ডিএনডি খালে পড়ে যাই। এতে ওপরের মাড়ির একটি দাঁত ভেঙে যায়।

জবানবন্দিতে সাক্ষী বলেন, ৫ আগস্ট সকাল থেকেই খণ্ড খণ্ড মিছিল করতে থাকি। দুপুর দেড়টায় শামীম ওসমানের নেতৃত্বে অয়ন ওসমান, আজমেরী ওসমান, শাহ নিজাম, ফাইজুল ইসলাম, ছাত্রলীগ নেতা টিপু সুলতান, রিয়াদ, শুভ, শুভ্র, সাংবাদিক রাজু, কমিশনার ডিস বাবু, কেন্দ্রীয় ওলামা লীগের নেতা আনোয়ার, ছাত্রলীগ নেতা ভিকি, রুহুল কমিশনার, শামীম ওসমানের শ্যালক টিটুসহ প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন সশস্ত্র লোক আমাদের ওপর হামলা চালান। আন্দোলনটি চলছিল চাষাড়া মোড়ে। আওয়ামী লীগের ধাওয়া খেয়ে আমরা ল্যাবএইড হাসপাতাল গলির মধ্যে ঢুকে যাই। ঠিক তখন আমার সামনে অয়ন ওসমানের গুলিতে স্বজন নামে একটি ছেলে আহত হন। একপর্যায়ে আমরা তিন-চারজন মিলে তাকে ধরে সমবায় মার্কেটের নিচে নিয়ে পানি খেতে দেই। পরে রিকশায় করে স্বজনকে নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নেওয়া হয়। 

মামুন জানান, আগে থেকেই আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা না দেওয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন শামীম ওসমান। এজন্য স্বজনকে কোনো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। পরে তার বড় ভাইয়ের কাছে বুঝিয়ে দিয়ে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। ৬ আগস্ট বিজয় উদযাপনের সময় স্বজনের মৃত্যুর খবর পান তিনি। এ খবরে সবাই শোকাহত হয়ে পড়েন।

এ সময় ট্রাইব্যুনালের কাছে স্বজনসহ অন্যান্য হত্যার সঙ্গে জড়িত সবার বিচার দাবি করেন মামুন। সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তাকে জেরা করেন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী আমির হোসেন, আলী হায়দার ও মুসতাভী হাসান রাতুল।

প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার, আবদুল্লাহ আল নোমানসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।

মামলায় সব আসামিই পলাতক রয়েছেন। শামীম ওসমান ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন— শামীম ওসমানের ছেলে ইমতিনান ওসমান অয়ন, ভাতিজা আজমেরী ওসমান, অয়নের শ্যালক মিনহাজ উদ্দিন আহমেদ ভিকি, নারায়ণগঞ্জ রাইফেলস ক্লাবের সাবেক সভাপতি তানভীর আহমেদ টিটু, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসির নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি রাজু আহমেদ, ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আব্দুল করিম বাবু, ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর কামরুল হাসান মুন্না, নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম উদ্দিন আহমেদ, যুবলীগ নেতা শাহাদাত হোসেন সাজনু, ছাত্রলীগ নেতা হাবিবুর রহমান রিয়াদ ও সোহানুর রহমান শুভ্র।