দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের কুইন্সটাউনের নিকটবর্তী সমো টাউনে এক দোকানে আগুন লেগে ছয় বাংলাদেশি মারা গেছে। এ ঘটনায় আরো এক বাংলাদেশি আহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে পাঁচ জনের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ জেলায়, অন্যজনের বাড়ি মুন্সীগুঞ্জ।
প্রিটোরিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার শাহ আহমেদ শফী এ হতাহতের ঘটনা নিশ্চিত করে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন। জানা যায়, স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোররাত ৩টার দিকে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সেখানে মোট সাত জন ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল। ঘটনাস্থলেই ছয় জন মারা গেছে। মৃতরা হলো—নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার মনির হোসেনের ছেলে মো. ফাহিম, আলী মিয়ার ছেলে আপন আহমেদ, মৃত শরব আলীর ছেলে নুর মোহাম্মদ, ফারুক হোসেনের ছেলে মো. ফয়সাল, মৃত আক্তার হোসেনের ছেলে মো. শাহিন এবং মুন্সীগঞ্জের মৃত সালাম বেপারীর ছেলে মো. রাজিক।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার শাহ আহমেদ শফী গণমাধ্যমকে বলেন, ঘটনা জানার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। এটা দুর্ঘটনা, নাকি নাশকতা, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তিনি জানান, দক্ষিণ আফ্রিকার পূর্বাঞ্চলীয় যে এলাকায় অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে, সেটা রাজধানী প্রিটোরিয়া থেকে প্রায় ১ হাজার কিলোমিটার দূরে। পরিস্থিতি জানতে গতকালই দুর্ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হয়েছেন তিনি।
প্রিটোরিয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন এক বার্তায় জানিয়েছে, হাই কমিশনার শাহ আহমেদ শফী কুইন্সটাউন সফরকালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করবেন, নিহত ও আহত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়ে খোঁজ-খবর নেবেন এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এছাড়া তিনি সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রশাসন এবং দক্ষিণ আফ্রিকা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করবেন। বৈঠকে তিনি ঘটনার শেষ পরিস্থিতি, তদন্তের অগ্রগতি এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও পরবর্তী করণীয় বিষয়ে আলোচনা করবেন। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহায়তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ হাইকমিশন বদ্ধপরিকর বলে বার্তায় জানানো হয়েছে।
প্রসঙ্গত, এর আগেও দক্ষিণ আফ্রিকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে একাধিক বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছে। ২০১৮ সালের ২০ অক্টোবর নর্থ ওয়েস্ট প্রদেশের ব্রিটস শহরে একটি দোকানে আগুন লেগে ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার একই পরিবারের তিন জনসহ চার বাংলাদেশি মারা যায়। এছাড়া ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর কোয়াজুলু-নাটাল প্রদেশে একটি বাণিজ্যিক কমপ্লেক্সে অগ্নিকাণ্ডে আরো দুই বাংলাদেশির মৃত্যু হয়।
আগুন কেড়ে নিল সব :নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গত সোমবার দক্ষিণ আফ্রিকা প্রবাসী ছেলে আপনের সঙ্গে শেষ কথা হয় আলী মিয়ার। ছেলের খোঁজ-খবর নেওয়া শেষে জানতে চান দুপুরে খেয়েছে কিনা? উত্তরে টগবগে এই যুবক বাবাকে জানায়, সে রোজা রেখেছে। আলী মিয়ার পালটা প্রশ্ন—এটা কীসের রোজা বাজান? উত্তরে আপনের জবাব ‘আমি সোম ও বৃহস্পতিবারও রোজা রাখি বাবা’। তাহাজ্জুদও পড়ি। দক্ষিণ আফ্রিকায় আগুনে ছেলের মৃত্যুর খবরে বিলাপ করতে করতে এসব কথা বলছিল আলী মিয়া। তিনি বলেন, ‘যেখানে আমাদের চলে যাওয়ার কথা, সেখানে আমার জলজ্যান্ত ছেলেটা চলে গেল।’
আপনের মতোই পরিবারের ভাগ্যের চাকা ঘোরাতে প্রায় সাড়ে ১০ বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমায় ফাহিম। মাঝে দেশে ফিরলেও বিয়ে করা হয়নি। বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল এবার দেশে ফিরলে তাকে বিয়ের পিড়িতে বসাবেন। কিন্তু সেটি আর হলো না। অগ্নিকাণ্ডের খবর নারায়ণগঞ্জে এসে পৌঁছালে নিহতদের স্বজন এবং স্থানীয় এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। আগুনের শিকার সুপার শপটির মালিক আলীটেক ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার রওশন আলী। তিনি নিয়মিত দক্ষিণ আফ্রিকায় যাতায়াত করেন। অগ্নিকাণ্ডে যারা নিহত হয়েছেন, তারা পরস্পরের আত্মীয়। একই ওয়ার্ডে বাড়ি হওয়ায় নিজের দোকানে চাকরি দিয়ে তাদের আফ্রিকা নিয়েছিলেন রওশন আলী। ঘটনার খবর পেয়ে নিহতদের স্বজনদের পাশাপাশি দোকান মালিক রওশন আলীও বাক্রুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘যেহেতু আমি এখন দেশে তাই সেখানে (দক্ষিণ আফ্রিকা) ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।’ নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম ফয়েজ উদ্দিন বলেন, ‘সরকারিভাবে আমাদের কাছে তথ্য আসা মাত্র আমরা এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব। তাছাড়া যেহেতু দক্ষিণ আফ্রিকায় যেখানে ঘটনাটি ঘটেছে, সেটি স্থানীয় মেম্বার রওশন আলীর পারিবারিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, তাই হতাহতদের পরিবারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক খবর রাখতে তাকে অনুরোধ করেছি। লাশ দেশে এলে আমরা দ্রুত সব ধরনের ব্যবস্থা নেব।’ নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, সরকারিভাবে তথ্য পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজিকের পরিবারে মাতম: মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, দক্ষিণ আফ্রিকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মৃতদের মধ্যে মুন্সীগঞ্জের রাজিক বেপারী (৫২) নামে একজন রয়েছেন বলে পারিবারিক সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তিনি মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার মিরকাদিম পৌরসভার দক্ষিণ কালিন্দিপাড়া এলাকার মৃত সালাম বেপারীর ছেলে। তার মৃত্যুর খবর মুন্সীগঞ্জে দেশের বাড়িতে পৌঁছালে পরিবার ও এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। নিহতের বোন ফাতেমা জানান, মাত্র আড়াই মাস আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান রাজিক বেপারী। দেশে তার স্ত্রী ও তিনটি মেয়ে রয়েছে। স্ত্রী বর্তমানে আরো একটি সন্তান জন্ম দেওয়ার অপেক্ষায়।