কবি গোলাম মোস্তফা তাহার ‘কিশোর’ কবিতায় শিশুদের অমিত সম্ভাবনার কথা তুলিয়া ধরিয়া লিখিয়াছেন : ‘ঘুমিয়ে আছে শিশুর পিতা সব শিশুরই অন্তরে'। এই শিশুরাই আমাদের পৃথিবীর সবচাইতে বড় সম্পদ এবং আগামীর ভবিষ্যৎ। তাহাদের সুন্দরভাবে গড়িয়া তুলিবার উপরই নির্ভর করে মানবজাতির কল্যাণ। তাহাদের স্বপ্নই আগামী দিনের একটি শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ জাতির ভিত্তি; কিন্তু সেই ভিত্তি কি আজ নড়বড়ে হইয়া পড়ে নাই? বিশেষ করিয়া শিশুদের নিরাপত্তা লইয়া আমরা আজ কতটা চিন্তিত, তাহা প্রশ্নাতীত নহে। আজ আমাদের শিশুরা যেইভাবে অন্যায়, পৈশাচিক নির্যাতন ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হইতেছে, তাহা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সম্প্রতি ‘শিশুরাই সব' নামক উন্নয়ন সংস্থার ছয় মাসের মিডিয়া মনিটরিং রিপোর্টে যে ভয়াবহ চিত্র প্রতিফলিত হইয়াছে, তাহা হইতে আমাদের অবশ্যই শিক্ষা গ্রহণ করিতে হইবে এবং পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সর্বত্র গ্রহণ করিতে হইবে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ।
উপরোক্ত রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই দেশে অন্তত ৮৬ জন শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হইয়াছে এবং ৩৩৬ জন শিশু বর্বর যৌন নির্যাতনের মুখোমুখি হইয়াছে। ২০২৫ সালের সমগ্র বৎসরের পরিসংখ্যানের সহিত তুলনা করিলে দেখা যায়, মাত্র ছয় মাসেই এই অপরাধ বৃদ্ধি পাইয়াছে উদ্বেগজনক মাত্রায়। পরিতাপের বিষয়, নিহত ৮৬ জন শিশুর মধ্যে অধিকাংশ শূন্য হইতে ছয় বৎসর বয়সি অবোধ শিশু, যাহারা নিজেদের রক্ষা করিতে সম্পূর্ণরূপে অক্ষম। আবার ৩৩৬ জন যৌন নির্যাতিত শিশুর মধ্যে অর্ধেকেরও অধিক সাত হইতে ১২ বৎসর বয়সি নিষ্পাপ শিশু। এমনকি বাক্, বুদ্ধি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুরাও এই পৈশাচিক লালসার হাত হইতে নিষ্কৃতি পায় নাই! আরো আশঙ্কার বিষয়, অপরাধীদের অধিকাংশ শিশু অত্যন্ত পরিচিত ব্যক্তি। মাতাপিতা, নিকট আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক কিংবা স্থানীয় পরিচিত মানুষের হাতে অর্ধেকেরও অধিক শিশু নির্মমভাবে নিহত বা নির্যাতিত হইয়াছে। নিজ গৃহ ও পরিচিত পরিবেশ যেখানে একটি শিশুর জন্য সর্বাধিক নিরাপদ আশ্রয়স্থল হইবার কথা ছিল, তাহা আজ এমন বিপজ্জনক স্থানে পরিণত হইতেছে কেন? মূলত পারিবারিক কলহ, ব্যক্তিগত ক্ষোভ, পূর্বশত্রুতা ও পৈশাচিক লালসার বলি হইতেছে এই অবোধ শিশুরা। স্বীয় গৃহে অথবা পরিচিতদের নিকটেই যদি শিশুরা সুরক্ষিত না থাকে, তাহা হইলে এই চরম সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় আমাদিগকে কোন অন্ধকারের দিকে লইয়া যাইতেছে, তাহা ভাবিলে শরীর শিহরিত হইয়া উঠে।
দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বলিয়া গিয়াছেন, ‘একটি সমাজের চরিত্র প্রকাশ পায় সে তাহার শিশুদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে তাহা দেখিয়া'। প্রায় একই রকম কথা বলিয়াছেন ভারতের মহাত্মা গান্ধী : ‘আমরা যদি পৃথিবীতে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা করিতে চাই, তাহা হইলে আমাদের শিশুদের হইতে শুরু করিতে হইবে'। এই জন্য শিশু নির্যাতন ও অপরাধের সহিত জড়িত আসামিদের বিচারে কোনো প্রকার কালক্ষেপণ করা যাইবে না। বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে তাহাদের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করিতে হইবে, যাহাতে ভবিষ্যতে কেহ এমন অপরাধ করিতে দুঃসাহস না দেখায়। শিশুদের অধিকার রক্ষা, মনিটরিং ও সুরক্ষার লক্ষ্যে অবিলম্বে একটি ‘জাতীয় শিশু কমিশন' গঠন করা আবশ্যক। ‘শিশু আইন-২০১৩'-এর পূর্ণ বাস্তবায়নও জরুরি। সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিশুগৃহ ও সমাজসেবামূলক সংস্থায় সুনির্দিষ্ট ‘শিশু সুরক্ষা নীতিমালা' প্রণয়ন ও তাহা বাধ্যতামূলকভাবে বলবৎ করিতে হইবে। পরিবার ও সমাজের অভিভাবকগণকে নিজ নিজ সন্তানের নিরাপত্তা বিষয়ে হইতে হইবে আরও সজাগ ও সতর্ক। পরিচিত মানুষের সহিত মেলামেশার ক্ষেত্রেও শিশুদের প্রতি দৃষ্টি রাখিতে হইবে এবং শিশুদের আত্মরক্ষা ও স্পর্শসংক্রান্ত মৌলিক বিষয়ে সচেতন করিতে হইবে।
শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ গড়িয়া তুলিতে ব্যর্থ হইলে সমগ্র দেশই একদিন চরম অনিরাপদ হইয়া পড়িবে। এই জন্য কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তাহার বিখ্যাত ‘ছাড়পত্র' কবিতায় লিখিয়াছেন : ‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি—নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।' এই অঙ্গীকার আজ আমাদেরও গ্রহণ করিতে হইবে।