মিয়ানমারে অনলাইন প্রতারণা বা সাইবার স্ক্যাম চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশটির সামরিক-সমর্থিত সরকার। অপহরণ, বেআইনি আটক কিংবা নির্যাতনের মাধ্যমে মানুষকে স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করতে বাধ্য করার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে নতুন আইন পাস করেছে দেশটির পার্লামেন্ট।
বুধবার (২৯ জুলাই) যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্ট-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পার্লামেন্টের উভয় কক্ষে সংশোধনী অনুমোদনের পর ‘অ্যান্টি-অনলাইন স্ক্যাম বিল’ পাস হয়। ইউনিয়ন পার্লামেন্টের স্পিকার অং লিন ডুয়ে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত ভাষণে আইনটি পাস হওয়ার ঘোষণা দেন।
নতুন আইনে বলা হয়েছে, সাইবার প্রতারণার সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি যদি সহিংসতা, নির্যাতন বা অবৈধভাবে আটকে রেখে কাউকে স্ক্যাম সেন্টারে কাজ করতে বাধ্য করেন, তাহলে তার ১০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। আর ওই নির্যাতনের ফলে ভুক্তভোগীর মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে।
জানা গেছে, ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতায় থাকা সামরিক সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইং গত মে মাসেই এই আইনের খসড়ায় অনুমোদন দিয়েছিলেন।
কোভিড-১৯ মহামারির পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অনলাইন প্রতারণা কেন্দ্র দ্রুত বিস্তার লাভ করে। বিশেষ করে মিয়ানমার, কম্বোডিয়া ও লাওস আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে অনলাইন প্রতারণা চালানোর পাশাপাশি অনেককে পাচার বা জোরপূর্বক আটকে রেখে কাজ করানো হয়।
পর্যবেক্ষকদের মতে, নতুন সরকারের অধীনে এটি মিয়ানমারের প্রথম আইন। এর মাধ্যমে সামরিক সরকার আন্তসীমান্ত অপরাধ দমনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভাবমূর্তি উন্নত করার চেষ্টা করছে। তবে দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখনো সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকায় আইনটির কার্যকর বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, জুনের শেষ নাগাদ অবৈধভাবে মিয়ানমারে প্রবেশ করা ১৪ হাজার ৭১৮ বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়েছে। এছাড়া শ্বে কোক্কো ও কে কে পার্কসহ সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অনলাইন প্রতারণা ও অবৈধ জুয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৭৭টি ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়ার দাবি করেছে সরকার।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে অনলাইন প্রতারণাজনিত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৮৮ দশমিক ৩ বিলিয়ন থেকে ১১৪ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে। একই বছরে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই এ ধরনের প্রতারণায় প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির শিকার হয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) বলছে, কম্বোডিয়া, লাওস, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের সীমান্তবর্তী মেকং অঞ্চল বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় অনলাইন প্রতারণা ও অবৈধ অনলাইন জুয়ার কেন্দ্র। অন্যদিকে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সতর্ক করেছে, এসব স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে পালিয়ে আসা এবং পরে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, যা এখন একটি আন্তর্জাতিক মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে।