সময়মতো পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে শিল্পে গ্যাস-সংকট

দেশের শিল্প খাতে চলমান গ্যাস-সংকটসহ টেক্সটাইল খাতের নানা সমস্যা সমাধানে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পরবর্তী বৈঠক আয়োজনের নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।

গতকাল বুধবার সচিবালয়ে টেক্সটাইল শিল্পের সমস্যা সমাধানে গঠিত উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির প্রথম সভায় এসব আলোচনা হয়। সভা শেষে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল সাংবাদিকদের বলেন, সময়মতো সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কারণেই শিল্প খাতে গ্যাস-সংকটসহ বর্তমান নানা সমস্যা তৈরি হয়েছে। তবে সমস্যা সমাধানে সরকারের আন্তরিকতায় উদ্যোক্তারা আশাবাদী। তিনি বলেন, টেক্সটাইল খাতের বিদ্যমান সংকট নিরসনে সরকারের আন্তরিকতায় দেশের ব্যবসায়ীরা উদ্যোক্তা হিসেবে উৎসাহিত বোধ করছেন। গত ১৭ বছরে এ ধরনের সময়োপযোগী উদ্যোগ নেওয়া হলে শিল্প খাতের বর্তমান দুরবস্থা তৈরি হতো না। তার ভাষায়, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী টেক্সটাইল খাতের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছেন। বিদ্যমান অবস্থায় সরকারের যে মনোযোগ পাওয়া যাচ্ছে, তা গত ১৭ বছর পাওয়া গেলে বর্তমানের দুরবস্থা হতো না। বৈঠকে শিল্প খাতের গ্যাস-সংকটকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি টেক্সটাইল শিল্পের অন্যান্য সমস্যার কথাও তুলে ধরেন ব্যবসায়ীরা। পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলোর কোথায় কী ধরনের সহায়তা ও সুযোগ-সুবিধা প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করতে উদ্যোক্তাদের কাছ থেকে বিস্তারিত প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে সভায়।

সরকারের গঠিত উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির সভায় টেক্সটাইল খাতের মূল সমস্যা ও চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন শওকত আজিজ রাসেল। পরে কমিটির সদস্য এবং বিটিএমএর প্রতিনিধিদের মধ্যে এসব সমস্যা সমাধানের উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, প্রধানমন্ত্রী টেক্সটাইল খাতের সমস্যাগুলো সম্পর্কে অবগত এবং সমাধানে আন্তরিক ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ কারণেই দ্রুত সমাধানের প্রস্তাব তৈরির জন্য উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে ২২ জুলাই বিটিএমএর সভাপতির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সচিবালয়ে সাক্ষাত্ করে টেক্সটাইল শিল্পের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে। ঐ বৈঠকেই সমস্যাগুলো সমাধানে প্রস্তাব তৈরির জন্য উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। এর ধারাবাহিকতায় গতকাল কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিটিএমইএ জানিয়েছে, সভায় প্রধানমন্ত্রী একপর্যায়ে যোগ দিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য শোনেন এবং সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের বিষয়ে মতামত দেন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। বিটিএমএ এক প্রেস বার্তায় জানিয়েছে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পরবর্তী সভা আয়োজনের নির্দেশনা দেন। আলোচনাকালে প্রধানমন্ত্রী শিল্প খাতে চলমান গ্যাস-সংকট সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপারেও আশ্বাস প্রদান করেন বলে বিটিএমএ জানিয়েছে। বিটিএমএ প্রতিনিধিদলে পরিচালক মো. বাদশা মিয়া, সাবেক সহসভাপতি হোসেন মেহমুদ, সাবেক পরিচালক মো. মোশারফ হোসেন এবং প্রকৌশলী রাজীব হায়দার অংশগ্রহন করেন।

কারখানা চালাতে সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস চাইল বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ

এদিকে গত মঙ্গলবার পৃথক দুটি চিঠিতে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিট পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত কারখানাগুলোকে সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে সিলিন্ডারের মাধ্যমে গ্যাস সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হোক। তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোকে অনুমোদিত যানবাহনে সংযুক্ত নয় এমন খোলা সিলিন্ডার বা গ্যাস ক্যাসকেড সিলিন্ডারে প্রাকৃতিক গ্যাস বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার পর এই অনুরোধ জানানো হলো। তিতাস জানিয়েছে, এ ধরনের গ্যাস সরবরাহ নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এবং এটি ২০১০ সালের গ্যাস আইন ও ২০২৬ সালের গ্যাস বিতরণ বিধিমালার লঙ্ঘন।

বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও কনভার্শন ওয়ার্কশপ মালিক সমিতির সভাপতির কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশে ভয়াবহ গ্যাস-সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ কমে গেছে এবং অনিয়মিত গ্যাস সরবরাহের কারণে উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। চিঠিতে বলা হয়, অনেক শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ শূন্য পিএসআইয়ে নেমে গেছে। ফলে উত্পাদন চালিয়ে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী পণ্য পাঠানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিজিএমইএ অনুরোধ জানিয়েছে, যেসব কারখানা সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডারের মাধ্যমে গ্যাস সংগ্রহ করতে চায়, তাদের এই সুযোগ দেওয়া হোক, যাতে উত্পাদন চালু রাখা এবং রপ্তানি প্রতিশ্রুতি পূরণ করা সম্ভব হয়। তবে সংগঠনটি উল্লেখ করেছে, তিতাসের নির্দেশনার পর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলো সিলিন্ডারে গ্যাস সরবরাহ করতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে।

অন্য এক বিজ্ঞপ্তিতে বিকেএমইএ তাদের সদস্য কারখানাগুলোকে জানিয়েছে, তিতাসের নির্দেশনার বিষয়ে জানার পর সংগঠনের সভাপতি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, সংগঠনের সভাপতি মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন, রপ্তানিমুখী শিল্পে গ্যাস সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তা শিল্প উত্পাদনে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। সংগঠনটি জানিয়েছে, জ্বালানি বিভাগের সচিব তাত্ক্ষণিকভাবে তিতাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে রপ্তানিমুখী কারখানাগুলো সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে আগের মতো গ্যাস সংগ্রহ করতে পারে। বিকেএমইএ তাদের সদস্য কারখানাগুলোকে পরামর্শ দিয়েছে, সিএনজি স্টেশন থেকে গ্যাস সংগ্রহের সময় সব ধরনের নিরাপত্তা নির্দেশনা ও সরকারি নিয়ম মেনে চলতে হবে।