মালয়েশিয়ার উপকূলে নোঙর করা বিশাল এলাকা এখন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরানের তেল বিক্রির অন্যতম বড় হাব হয়ে উঠেছে। এই তেলের শেষ গন্তব্য চীন।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) আল জাজিরায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
গত শনিবার (২৫ জুলাই) ইরানের তেলবাহী জাহাজ ‘হিউম্যানিটি’ মালাক্কা প্রণালি ও সিঙ্গাপুর হয়ে মালয়েশিয়ার উপকূলের দিকে এগোচ্ছিল। হঠাৎ করেই জাহাজটির স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বা এআইএস বন্ধ করে দেওয়া হয়। স্যাটেলাইট ট্র্যাকিংয়ের তথ্য বলছে, ৩৩০ মিটার লম্বা এই অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজটি এখন মালয়েশিয়ার ‘ইস্টার্ন আউটার পোর্ট লিমিটস’ বা ইওপিএল এলাকায় পৌঁছেছে। দক্ষিণ চীন সাগরে অবস্থিত এই বিস্তীর্ণ এলাকা উপকূল থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে এবং প্রায় ১,২০০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে আছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাহাজটি সম্ভবত অন্য জাহাজে তেল স্থানান্তরের প্রস্তুতি নিতেই ট্র্যাকিংয়ের বাইরে চলে গেছে। ইউএস-চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড সিকিউরিটি রিভিউ কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এই তেলের চূড়ান্ত গন্তব্য চীন। ঐতিহাসিকভাবেই ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই চীন কিনে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, দশকের পর দশক ধরে ইওপিএল এলাকাটি ইরান, রাশিয়া ও ভেনিজুয়েলার নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত তেলের এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক বাজার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের পাঁচ মাসব্যাপী সংঘাত এবং ইরানের বন্দরগুলোতে মার্কিন নৌ-অবরোধের পরও এই কার্যক্রম বন্ধ হয়নি।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত মেরিটাইম সিকিউরিটি মনিটরিং প্রজেক্ট সিলাইটের পরিচালক রে পাওয়েল আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, এ বছরের শুরু থেকে তিনি এমন ৬২টি জাহাজ পর্যবেক্ষণ করেছেন, যেগুলো উপসাগরীয় অঞ্চল, ইওপিএল, হংকং ও উত্তর চীনের মধ্যে চলাচলের সময় ভুয়া বা বাতিল পরিচয় ব্যবহার করেছে। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষক এরিকা ডাউন্স বলেন, এসব জাহাজ মূলত মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি নেটওয়ার্কের অংশ। তারা চীনের স্বাধীন ছোট শোধনাগার বা ‘টিপট’গুলোতে ইরানি তেল পৌঁছে দিতে সহায়তা করে।
এরিকা ডাউন্স আরও জানান, ইরান থেকে চীনে যাওয়া অপরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক জলসীমায় এক জাহাজ থেকে আরেক জাহাজে স্থানান্তর করা হয়। উৎস গোপন রাখতে চীনে পৌঁছানোর আগে এই প্রক্রিয়া একাধিকবার হতে পারে। চীনের বড় রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলোর তুলনায় এই ছোট শোধনাগারগুলো মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে থাকে। তাই তারা নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ইরানি তেল কম দামে কিনতে বেশি আগ্রহী।
ইয়োকোসুকা কাউন্সিল অন এশিয়া-প্যাসিফিক স্টাডিজের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কর্মসূচির পরিচালক ও মেরিটাইম নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ চার্লি ব্রাউন বলেন, মালয়েশিয়ার ইওপিএল সংলগ্ন নোঙর এলাকা আগের মতোই ব্যস্ত। যুদ্ধের আগে এবং সংঘাতের প্রতিটি পর্যায়েই সেখানে জাহাজ নোঙর করা ও জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের মতো কার্যক্রম চলতে দেখা গেছে।
এলাকাটির সুবিধা হলো এর শান্ত জলসীমা। এটি সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার সরবরাহকারীদের কাছাকাছি, আবার এমন দূরত্বে যে ঐতিহাসিকভাবেই এটি আইনি ধূসর অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হয়। মালয়েশিয়ার আঞ্চলিক জলসীমার বাইরে হলেও এটি তাদের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোনের আওতাভুক্ত। তবে এখানে নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার চেয়ে মাছ ধরা ও প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের বিষয়গুলোই বেশি প্রাধান্য পায়। মালয়েশিয়ার মেরিটাইম এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি আগেই জানিয়েছিল, দুর্গম অবস্থান ও অধিক্ষেত্রগত সীমাবদ্ধতার কারণে ওই এলাকায় টহল দেওয়া কঠিন।
কুয়ালালামপুর অবশ্য তাদের আইন শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। অবৈধ নোঙর, বাঙ্কারিং এবং সরকারি অনুমোদন ছাড়া ইইজেডে জাহাজ থেকে জাহাজে পণ্য স্থানান্তর ঠেকাতে গত জুনে মালয়েশিয়া তাদের ইইজেড আইন সংশোধন করেছে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো মন্তব্য করেনি।
চার্লি ব্রাউনের মতে, যেকোনো সাধারণ দিনেই ওই এলাকায় প্রায় ২০০টি জাহাজ নোঙর করা থাকতে পারে। এর অর্ধেকই সম্ভবত ইরানের সঙ্গে যুক্ত। আলজাজিরার পর্যালোচনা করা স্যাটেলাইট তথ্যে দেখা গেছে, গত এক মাসে হিউম্যানিটিসহ ইরানের পতাকাবাহী ১৮টি তেলের ট্যাংকার ইওপিএল-এ পৌঁছানোর পর ট্র্যাকিংয়ের বাইরে চলে গেছে। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) আরেকটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার ডোরকে মালাক্কা প্রণালি দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে যেতে দেখা গেছে। ওইদিন ইওপিএল-এ অন্তত ৫০টি মার্কিন বা ইইউ-নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত জাহাজ তাদের এআইএস সিগন্যাল চালু রেখে অবস্থান করছিল। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, সেখানে আরও অনেক ডার্ক জাহাজ রয়েছে।
ইউরোপভিত্তিক সংস্থা জিওপলিটিক্যাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিসেসের মতে, ইওপিএল-এ স্থানান্তরিত ইরানি তেলের কেনাবেচা চীনের ক্রস-বর্ডার ইন্টারব্যাংক পেমেন্ট সিস্টেম বা সিআইপিএসের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। এর ফলে মার্কিন নজরদারিতে থাকা সুইফট নেটওয়ার্কের বাইরে গিয়ে চীনা মুদ্রা রেনমিনবিতে অর্থ পরিশোধ করা যায়।
চীন আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের তেল কেনার কথা স্বীকার করে না। ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনা দূতাবাসের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, ইওপিএল হয়ে চীনে ইরানি তেল পরিবহনের বিষয়ে তারা অবগত নন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একাধিকবার বলেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিহীন ‘লং-আর্ম জুরিসডিকশন’-এর বিরোধী।
গবেষক এরিকা ডাউন্স বলেন, চীনের কাস্টমস ডেটা কিছু সূত্র দেয়। গত বছর ইরান চীনে প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে। কিন্তু চীনের কাস্টমসের তথ্যে ইরান থেকে তেল আমদানির কোনো হিসাব নেই। একই সময়ে মালয়েশিয়া থেকে চীনের আমদানি মাঝেমধ্যেই মালয়েশিয়ার নিজস্ব তেল উৎপাদনের পরিমাণকে ছাড়িয়ে যায়। এ থেকে বোঝা যায়, ওই তেলের একটি অংশ অন্য উৎস থেকে এসেছে।
বেইজিং মার্কিন আইনি ব্যবস্থা থেকে নিজস্ব শোধনাগারগুলোকে রক্ষা করতেও পদক্ষেপ নিয়েছে। এপ্রিলের শেষ দিকে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরানি তেল কেনার দায়ে পাঁচটি টিপট শোধনাগারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সেই নির্দেশ ব্লক করে দেয়। তাদের দাবি, এটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ আরও ছয়টি তেলের ট্যাংকার ও হংকং-চীনভিত্তিক পাঁচটি কোম্পানির ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এগুলো ইরানের শ্যাডো ফ্লিটের সঙ্গে যুক্ত এবং চীনে তেল পরিবহন করেছে। এ বিষয়ে বেইজিং এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের মতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে চীনা শোধনাগারগুলোর ইরানি তেল কেনার পরিমাণ প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইওপিএল-এর মতো নেটওয়ার্কগুলো বাকি তেলের বিক্রি সচল রেখেছে। চার্লি ব্রাউন বলেন, নিষেধাজ্ঞা কখনোই এসব কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি। বরং নিষেধাজ্ঞার কারণেই বাজার ও লেনদেন প্রক্রিয়ার পরিবর্তন ঘটেছে। একমাত্র অবরোধের কারণেই ইরান থেকে চীনে তেল যাওয়া কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।