ব্রাজিলে নতুন মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনীত ড্যানিয়েল পেরেজের দায়িত্ব গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক অনুমোদন এখনো দেয়নি ব্রাজিল সরকার। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই বিলম্বে মার্কিন কর্মকর্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এ নিয়ে সৃষ্ট টানাপোড়েনে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে ফাটল দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী অক্টোবরে ব্রাজিলে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই বিরোধের কারণে নির্বাচনের আগে ব্রাজিলে হয়তো কোনো মার্কিন রাষ্ট্রদূত থাকবেন না। ইতোমধ্যে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। পাশাপাশি পরস্পরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অভিযোগও উঠেছে।
গত্লোরিডার প্রতিনিধি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর ঘনিষ্ঠ মিত্র ড্যানিয়েল পেরেজকে গত ১ জুন ব্রাজিলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনীত করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্তত চারজন সূত্র জানিয়েছে, ব্রাজিলের সম্মতি নেওয়ার আগেই তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। কূটনীতিতে এ ধরনের পূর্বানুমতি ‘আগ্রেমো’ নামে পরিচিত।
ব্রাসিলিয়ার কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, এই শিষ্টাচার লঙ্ঘনকে তারা অবমাননাকর হিসেবে দেখছেন। গত সপ্তাহে সিনেট কমিটির অনুমোদন পাওয়ার পর পেরেজের মনোনয়ন এখন পূর্ণাঙ্গ সিনেটের ভোটের অপেক্ষায়। তবে ব্রাজিলের আনুষ্ঠানিক সম্মতি না পাওয়া পর্যন্ত তিনি পদে যোগ দিতে পারবেন না।
মার্কিন দুই সূত্র জানিয়েছে, ব্রাজিলের এই ধীরগতির বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ। চলতি সপ্তাহের মধ্যে সমাধান না হলে যুক্তরাষ্ট্র শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে এক সূত্র।
বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুই ইনাসিও লুলা দ্য সিলভার প্রশাসনের সঙ্গে রুবিওর নেতৃত্বাধীন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই উত্তপ্ত। লাতিন আমেরিকায় রক্ষণশীল শক্তিকে প্রভাবিত করার চেষ্টার অভিযোগ করে আসছে লুলার সরকার। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন অভিযোগ করছে, ব্রাজিলের বিচার বিভাগ রক্ষণশীলদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় বিশ্বে কে প্রতিনিধিত্ব করবেন, তা নির্ধারণের অধিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রয়েছে। সিনেটের পরামর্শ ও সম্মতিতে তিনি আমেরিকা ফার্স্ট নীতির ভিত্তিতে কূটনৈতিক দল গঠন করছেন। বিদেশি কোনো রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ তারা প্রত্যাখ্যান করেন।
ব্রাজিলের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কূটনৈতিক নিয়ম মেনেই পেরেজের বিষয়ে তদন্ত চলছে। একজন বলেছেন, ৪ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে হয়তো অনুমোদন দেওয়া হবে না। আমরা বলছি না যে আগ্রেমো দেওয়া হবে না। তবে এর কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। উপযুক্ত সময় নির্ধারণের এখতিয়ার সম্পূর্ণ স্বাধীন দেশের।
ব্রাজিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী এই প্রক্রিয়া গোপনীয়। তাই তারা কোনো মন্তব্য করবে না। পেরেজের ফ্লোরিডার কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
অক্টোবরের নির্বাচনে লুলা চতুর্থ মেয়াদের জন্য লড়ছেন। তার অন্যতম প্রধান স্লোগান ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব’। প্রতিদ্বন্দ্বী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো, যিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে এবং ট্রাম্পকে মিত্র হিসেবে তুলে ধরছেন।
জুনে যুক্তরাষ্ট্র ব্রাজিলের দুটি অপরাধী সংগঠনকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে। চলতি মাসে বাণিজ্যিক বৈষম্যের অভিযোগে ব্রাজিলের কিছু পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়। পরে জোরপূর্বক শ্রমের উদ্বেগ দেখিয়ে আরও ১২.৫ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক চাপানো হয়।
এর কয়েক দিন পর ট্রাম্প প্রশাসনের দুই কর্মকর্তা ব্রাজিলের নির্বাচনী ব্যবস্থার সততা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করতে দেশটিতে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করে ব্রাজিল। সাম্প্রতিক জরিপে লুলা ফ্লাভিও বলসোনারোর চেয়ে সামান্য এগিয়ে আছেন।
সিনেট কমিটির শুনানিতে পেরেজ বলেছেন, অনুমোদন পেলে অক্টোবরের নির্বাচনই হবে তার প্রথম অগ্রাধিকার। দুই দেশের বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ বজায় রাখতে কাজ করবে যুক্তরাষ্ট্র। জ্বালানি ও কৃষি খাতে এখনো বড় বৈষম্য রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।