বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ক্রমশ বাড়িয়া চলিয়াছে। এই মৃত্যুর মিছিল আর বন্ধ হইবে কবে? প্রতিদিনই সংবাদপত্রের পাতায় পড়ি স্বজন হারানোর বুকফাটা আর্তনাদের খবর। সম্প্রতি সিলেটে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাইয়াছেন একজন স্কুলশিক্ষক এবং দৈনিক ইত্তেফাকের প্রশাসন বিভাগের প্রধানের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া প্রাণপ্রিয় সন্তান। যেই পিতা সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়া ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনিতেছিলেন, তাহার কোল খালি করিয়া এক নিমেষে সকল শেষ হইয়া গেল!
আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার খবর এখন অতি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হইয়াছে। নিরাপদ সড়কের আকুল প্রত্যাশা এখনো অরণ্যে রোদন ছাড়া আর কিছুই নহে। ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর যখন দেশে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ প্রণয়ন ও জাতীয় সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা ২০২০ গ্রহণ করা হইল, তখন দেশবাসী কিছুটা আশার আলো দেখিয়াছিলেন। তাহারা ভাবিয়াছিলেন, কঠোর আইনের প্রয়োগে এই বুঝি সড়কে বিশৃঙ্খলা থামিবে, ড্রাইভারদের বেপরোয়া মনোভাব কমিয়া আসিবে, ট্রাফিক পুলিশ সড়কে শৃঙ্খলা আনয়নে আরো তৎপর হইবেন এবং পথচারী ও যাত্রীদের মধ্যে ফিরিয়া আসিবে সচেতনতা ও সুশৃঙ্খলাবোধ; কিন্তু নিদারুণ বাস্তবতা হইল, আইন ও পরিকল্পনা শুধু কাগুজে বাঘ হইয়া রহিয়া গেল, আর সড়কে প্রাণহানির সংখ্যা দিনদিন উদ্বেগজনকভাবে বাড়িতেই লাগিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমিয়া যাইবার কথা: কিন্তু কমিবার বদলে বাড়িতেছে কীভাবে? জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বৎসর সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে ৬ হাজার হইতে ৮ হাজারেরও অধিক মানুষ প্রাণ হারান, আর আহত ও পঙ্গুত্ব বরণ করেন হাজার হাজার নিরীহ পথচারী ও যাত্রী। কাহারো কাহারো মতে, শুধু নিহতের সংখ্যা ২০ সহস্রাধিক। যুদ্ধেও অনেক সময় এত লোক হতাহত হন না!
গবেষণা-প্রতিষ্ঠান রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ২০১৯ হইতে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সাড়ে সাত বৎসরে সড়ক দুর্ঘটনায় কেবল শিক্ষার্থী প্রাণ হারাইয়াছে ৭ হাজার ৩৬৪ জন। নিহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে সবচাইতে অধিক ৩ হাজার ৮৪১ জন ছিলেন মোটরসাইকেলের চালক বা আরোহী। শুধু তাহাই নহে, একই সময়ে রেললাইন পারাপার বা হেডফোন ব্যবহার করিয়া রেললাইন ধরিয়া হাঁটার সময় ট্রেনে কাটা পড়িয়া আরো ১ হাজার ২৩৭শিক্ষার্থী নিহত হইয়াছেন। তাই সড়ক দুর্ঘটনা কমাইতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সড়ক নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, সচেতনতামূলক প্রচার, অনিরাপদ যান বন্ধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে নিরাপত্তা জোরদার এবং অপ্রাপ্তবয়স্কদের মোটরসাইকেল চালানো কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার।
বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত 'ডেলিভারিং রোড সেফটি ইন বাংলাদেশ: লিডারশিপ প্রায়োরিটিস অ্যান্ড ইনিশিয়েটিভস টু ২০৩০' শীর্ষক এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে দুর্ঘটনাকবলিত প্রতি ১০ হাজার যানবাহনে মারা যান ১০২ জন। পার্শ্বের দেশ ভুটানে এই সংখ্যা ১৬ দশমিক ৭০, ভারতে ১৩, নেপালে ৪০ ও শ্রীলঙ্কায় সাত জন। তাই যানবাহনের ফিটনেসহীনতা বা ত্রুটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর বটে। ইহা ছাড়া চালকদের বেপরোয়া মনোভাব, অদক্ষতা, নিয়ন্ত্রণহীন গতি, ট্রাফিক আইনের শিথিল প্রয়োগ ও অনিয়ম, অবৈধ যানবাহন, অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের দৌরাত্ম্য ইত্যাদি তো আছেই। এখন এই ঘাতক চক্র হইতে পরিত্রাণের উপায় কী? আমরা মনে করি, চালকদের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে আমূল সংস্কার আনিয়া কঠোর পরীক্ষা পদ্ধতি গ্রহণ করিতে হইবে। ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়কে চিরতরে নিষিদ্ধ করিতে হইবে। সড়ক-মহাসড়কগুলির প্রয়োজনীয় সংস্কারপূর্বক মোড়ে মোড়ে আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা ও ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম চালু করিতে হইবে। ড-ইঞ্জিনিয়ারিং, সাইন-সিম্বল ও প্রয়োজনীয় ফুটপাত-ফুটওভারব্রিজ ইত্যাদি নির্মাণেও গুরুত্বারোপ করিতে হইবে। বিশেষ করিয়া, ট্রাফিক আইন অমান্যকারীদের তাৎক্ষণিক শাস্তির আওতায় আনিতে হইবে। এই ব্যাপারে জনসাধারণকে আরো সচেতন করিতে হইবে। হতাহতদের ক্ষতিপূরণ প্রদানে সরকারকে হইতে হইবে আন্তরিক ও উদ্যোগী।
সিলেটের সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের বিবেককে আবার নাড়া দিয়া গেল। আর কত মায়ের বুক খালি হইলে, আর কত পিতার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হইলে আমাদের ঘুম ভাঙিবে? এই মুহূর্তে সড়ক-মহাসড়কে ঘাতকের হাত হইতে জনগণকে মুক্ত করা কি সরকারের নৈতিক দায়িত্ব নহে?