‘প্রতিদিন আরও দুর্বল হয়ে পড়ছি, ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি’

ওষুধ ও চিকিৎসার জন্য রোগীদের সরিয়ে নেওয়ার ওপর ইসরায়েলি বিধিনিষেধের কারণে হাজার হাজার ক্যানসার রোগী জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দক্ষিণ গাজার একটি আশ্রয়কেন্দ্রের ভবনের সিঁড়ির নিচে বসে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ে ধীরে ধীরে হেরে যাচ্ছেন ৩৩ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকা খুলুদ আবু সাহমুদ।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) মিডল ইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫টি কেমোথেরাপি সেশন নেওয়ার পর দুই সন্তানের এই জননীকে জানিয়ে দেওয়া হয়, গাজায় বর্তমানে যেসব ওষুধ রয়েছে, তা তার ক্যানসারের ধরনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। 

চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে আবু সাহমুদের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটছে বলে জানা গেছে। 

আবু সাহমুদ বলেন, ‘চিকিৎসক জানিয়েছেন এই কেমোথেরাপি আমার শরীরে কোনো কাজ করছে না। এতে ক্যানসার নিরাময় তো হচ্ছেই না, উল্টো আমার চুল ও নখ ঝরে পড়ছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য আমাকে জর্ডান বা তুরস্কে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও নয় মাস ধরে আমি অনুমতির অপেক্ষায় প্রহর গুনছি। আমি প্রতিদিন আরও দুর্বল হয়ে পড়ছি, আর ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে 
যাচ্ছি।’

এর আগে, গত বছরের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রায় ১০ মাস পরও গাজায় জীবন রক্ষাকারী জরুরি ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশের ওপর বিধিনিষেধ অব্যাহত রেখেছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে রয়েছে ক্যানসারের ওষুধ, কেমোথেরাপি, অ্যান্টিবায়োটিক, চেতনানাশক, পরীক্ষাগারের সরঞ্জাম, রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি এবং সার্জারির বিভিন্ন উপকরণ।

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, গত মার্চের মধ্যেই গাজায় প্রায় ৪৬ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ এবং ৬৬ শতাংশ চিকিৎসা সরঞ্জামের মজুত পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়।

চলতি মাসে ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্যানসারের বিশেষ ওষুধের মজুত তলানিতে ঠেকায় স্তন, কোলোরেক্টাল ও গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ক্যানসার, মাথা ও ঘাড়ের টিউমার এবং সারকোমাসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের কেমোথেরাপি চিকিৎসা অনেকাংশেই বন্ধ হয়ে গেছে।

মন্ত্রণালয় জানায়, গাজার প্রায় ১১ হাজার ক্যানসার রোগীর মধ্যে অন্তত ৪ হাজার জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার মেডিকেল রেফারেল দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা এখনো গাজা ছাড়ার অনুমতির অপেক্ষায় আছেন।

গাজা সেন্টার ফর ক্যানসারের পরিচালক ড. মোহাম্মদ আবু নাদা বলেন, চরম সংকটের কারণে আমরা মেয়াদোত্তীর্ণ কিছু ওষুধ ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিলাম। এখন সেগুলোও ফুরিয়ে গেছে। এতে স্পষ্টতই মৃত্যুর হার বাড়ছে।

আবু নাদা জানান, গাজায় বর্তমানে কেমোথেরাপির ওষুধের যে চরম সংকট চলছে, তা গত কয়েক বছরের মধ্যে ভয়াবহতম।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গাজার প্রায় চার হাজার শিশুসহ ২০ হাজারের বেশি মানুষ জরুরি চিকিৎসাজনিত স্থানান্তরের অপেক্ষায় রয়েছেন। তবে সীমান্ত ক্রসিংগুলোতে কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রতিদিন হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন গাজা ছাড়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত শুধু চিকিৎসার অনুমতির অপেক্ষায় থাকা অবস্থাতেই ১ হাজার ৫৭০ জনের বেশি রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

পিএইচডি ডিগ্রিধারী সহকারী অধ্যাপক আবু সাহমুদ আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি শিখতে এবং পড়াতে ভালোবাসতাম। কিন্তু এই অসুস্থতা ও অন্তহীন অপেক্ষা আমার জীবনের সব স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে। গাজায় এখন সুস্থ মানুষের টিকে থাকাই কঠিন, সেখানে ক্যানসার রোগীদের জন্য টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব।’