তোপের মুখে পড়ে পরিকল্পনা থেকে সরে এল ফিফা, ইউটার্ন ইনফান্তিনোর

তীব্র সমালোচনা ও সদস্য দেশগুলোর প্রবল বিরোধিতার মুখে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক ও আয়োজক কার্যক্রমে অংশীদারিত্ব বিক্রির পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে ফিফা। নাটকীয়ভাবে অবস্থান বদলে পুরো প্রস্তাবই প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন সংস্থাটির সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।

শুক্রবার (৩১ জুলাই) গভীর রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইনফান্তিনো বলেন, ‘সব মতামত মনোযোগ দিয়ে শোনার পর এটা স্পষ্ট হয়েছে যে এই প্রকল্পটি এমন বিভাজন তৈরি করেছে, যা সমর্থনের মাত্রা যা-ই হোক না কেন, শুরুতে নির্ধারিত লক্ষ্যের স্বার্থে আর যায় না। আমাদের উদ্দেশ্য সব সময় ছিল সবাইকে একত্রিত করা, আর খেলাটাকে উন্নত করা; সবসময় তাই থাকবে। সে কারণে এই প্রস্তাব আর এগোচ্ছে না।’

ফিফার এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো অবস্থান নেয় ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা, উত্তর ও মধ্য আমেরিকার কনকাকাফ এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)। উয়েফা সতর্ক করে জানিয়েছিল, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে তাদের ৫৫ সদস্য দেশ বিশ্বকাপসহ ফিফার সব প্রতিযোগিতা বয়কট করবে।

এর আগে শুক্রবার সকালে ফিফা এক বিবৃতিতে দাবি করেছিল, ‘কেউ ফুটবল বিক্রি করছে না’ এবং তারা ‘জনসম্মুখে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগকে স্বীকার ও সম্মান করে’ জানিয়েও এই প্রস্তাবের সঙ্গেই এগিয়ে যাবে। ফিফা আরও জানিয়েছিল, তারা ‘একটা উন্মুক্ত এবং গণতান্ত্রিক আলোচনার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছে।’

কিন্তু সেই বিবৃতির কিছুক্ষণের মধ্যেই উয়েফা ও কনকাকাফের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে এএফসি। এরপরই ইনফান্তিনোর ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়।

এর মধ্যে বড় ধাক্কা আসে ফিফার ভেতর থেকেই। ইনফান্তিনোর উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরো পদত্যাগ করে এক বিবৃতিতে পরিকল্পনাটিকে ‘ফিফার সদস্য সংস্থাগুলোর জন্য খারাপ চুক্তি, ফুটবলের জন্য খারাপ চুক্তি এবং খেলাটির দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যতের জন্যও ক্ষতিকর’ বলে মন্তব্য করেন।

আরেকটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেন ফিফার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) কেভিন লামুর। তিনি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, ইনফান্তিনো নিজের কর্মীদের সঙ্গে ‘প্রতারণা’ করেছেন। এ নিয়ে কথা বলার পর চাকরি হারানোর ঝুঁকি থাকলেও তিনি এখন স্বস্তি বোধ করছেন।

লামুরের ভাষ্য, ‘এটা একজন মানুষের প্রকল্প। এই প্রকল্প শুধু এগিয়ে যাওয়াই উচিত না... বরং এখন সময় এসেছে ফুটবলের রাজনৈতিক নেতাদের সঠিক প্রশ্ন করার এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার।’

একের পর এক বিরোধিতা ও অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে শুক্রবার বিকেল পর্যন্তও ফিফা পরিকল্পনায় অটল থাকবে বলে ধারণা করা হলেও শেষ পর্যন্ত সংস্থাটি পুরো প্রস্তাবই বাতিল করে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জশুয়া কুশনারের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ শুক্রবার রাত পর্যন্ত এই বিনিয়োগ পরিকল্পনা থেকে সরে না এলেও ফিফা প্রস্তাব বাতিল করায় সেটি আর কার্যকর থাকেনি।

গত মঙ্গলবার ফিফা ঘোষণা দিয়েছিল, ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজেস’ (এফএফই) নামে একটি নতুন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশ্বকাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপের মতো প্রধান টুর্নামেন্ট পরিচালনার দায়িত্ব থাকত এই প্রতিষ্ঠানের ওপর। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এফএফইর ২১ শতাংশ সংখ্যালঘু মালিকানা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে প্রায় ৪২০ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য ছিল ফিফার।

ফিফার দাবি ছিল, ‘ফিফা ফাস্ট-ফরওয়ার্ড প্রোগ্রাম’-এর আওতায় ওই অর্থ দ্রুত বিশ্বের ২১১টি সদস্য সংস্থার মধ্যে বিতরণ করা সম্ভব হবে। এতে আগামী চার বছরে সংস্থাটির উন্নয়ন তহবিল ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়ে যেত।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রস্তাবের বিরোধিতা করলেও সদস্য সংস্থাগুলো ২০২৭-৩০ চক্রে ২ কোটি ডলার, ২০৩১-৩৪ চক্রে ২ কোটি ২০ লাখ ডলার এবং ২০৩৫-৩৮ চক্রে ২ কোটি ৪০ লাখ ডলার করে পেত। আর যারা প্রস্তাবে সম্মতি দিত, তারা ২০২৭-৩০ চক্রেই পেত ৪ কোটি ডলার।

তবে ফিফার এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া উয়েফা, কনকাকাফ ও এএফসি মিলিয়ে সংস্থাটির ২১১ সদস্যের মধ্যে ১৩৭টির প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে প্রস্তাবটি পাস করানো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ে। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, পরিকল্পনাটি কার্যকর করতে সদস্য সংস্থাগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থনের পাশাপাশি ৩৭ সদস্যের ফিফা কাউন্সিলের অনুমোদনও প্রয়োজন ছিল।

দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল কনফেডারেশন কনমেবলও শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানায়, আর্থিক ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত অবশ্যই ফুটবলের স্বার্থ রক্ষা করবে; খেলাটির মৌলিক মূল্যবোধের ওপর কখনো প্রাধান্য পাবে না। এর কয়েক ঘণ্টা পরই পুরো পরিকল্পনা বাতিলের ঘোষণা দেয় ফিফা।

দ্য অ্যাথলেটিক জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার উয়েফা ও কনকাকাফের বৈঠকে ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেপ ব্লাটারের উত্তরসূরি হিসেবে ফিফার দায়িত্ব নেন ইনফান্তিনো। আগামী ২০২৭ সালের মার্চে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে তার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তবে সাম্প্রতিক এই বিতর্ক তার অবস্থানকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

নরওয়ের ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি লিসে ক্লাভেনেস বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমার স্পষ্ট ধারণা হলো, তিনি অনেক বিশ্বাস হারিয়েছেন। গতবার আমরা তাকে ভোট দিইনি, আর এই বিষয়ে আমরা সন্দিহান ছিলাম। ফিফার অনেক ভালো দিক আছে, তবে শাসন নীতি ও নিয়মের ব্যাপারে যদি শিথিল মনোভাব দেখানো হয়, তাহলে দ্রুতই বিশ্বাস হারিয়ে যায়।’