রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: সরকারের কূটনৈতিক অগ্রগতি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

প্রায় এক দশকের অচলাবস্থার পর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী ও ধারাবাহিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সক্রিয় মধ্যস্থতায় মিয়ানমারের সঙ্গে প্রত্যাবাসন আলোচনা একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত প্রায় পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমারের ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ এবং বাংলাদেশ থেকে বৃহৎ পরিসরে প্রত্যাবাসনের আলোচনা এগিয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি। প্রথম ধাপে তিন লাখ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা পাওয়া গেছে, যা দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে একটি সম্ভাবনাময় পথ উন্মুক্ত করেছে। এই অগ্রগতি বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্যের একটি উল্লেখযোগ্য প্রতিফলন এবং টেকসই সমাধানের পথে একটি আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ।

রোহিঙ্গা সংকট একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী মানবিক ও ভূরাজনৈতিক সংকট। এটি শুধু শরণার্থী সমস্যা নয়; বরং মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের পর সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। এর আগে ১৯৭৮ এবং ১৯৯১–৯২ সালেও বড় আকারে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। বর্তমানে বাংলাদেশে ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা অবস্থান করছে, যাদের অধিকাংশ কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শিবিরে এবং একটি অংশ ভাসানচরে রয়েছে। মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে বাংলাদেশ নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, সীমান্ত নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। তাই নিরাপদ, স্বেচ্ছাসেবী, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন এখন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান জাতীয় অগ্রাধিকার।

রোহিঙ্গা সংকটের মূল শিকড় মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের বৈষম্যমূলক নীতিতে নিহিত। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের কার্যত নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়। পরবর্তীতে তাদের চলাচল, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক অধিকার সীমিত করা হয়। ২০১৭ সালের সামরিক অভিযানে এই বৈষম্য চরম রূপ নেয় এবং লাখো মানুষ দেশত্যাগে বাধ্য হয়।

জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠে। ২০১৯ সালে গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘনের অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) সীমান্ত অতিক্রম করে সংঘটিত সম্ভাব্য অপরাধের তদন্ত করছে। এসব প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে সংকটটির গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করেছে। আন্তর্জাতিক আইনের মূলনীতি অনুযায়ী কোনো শরণার্থীকে এমন স্থানে ফেরত পাঠানো যাবে না, যেখানে তার জীবন ও নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তাই রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন অবশ্যই নিরাপদ, স্বেচ্ছাসেবী, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই হতে হবে। শুধু সীমান্ত পার করে দেওয়া নয়; নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, বসবাসের অধিকার ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করেই প্রকৃত প্রত্যাবাসন সম্ভব।

জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা—UNHCR, WFP, UNICEF, WHO ও IOM—দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দিয়ে আসছে। বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের যৌথ উদ্যোগে খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, পানি, স্যানিটেশন ও সুরক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় এই কার্যক্রমও ক্রমশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। রোহিঙ্গাদের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান বাংলাদেশের জন্য বহুমাত্রিক চাপ সৃষ্টি করেছে। কক্সবাজার অঞ্চলে বন উজাড়, পাহাড় ধ্বংস, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং স্থানীয় জনগণের কর্মসংস্থান ও সামাজিক সেবার ওপর চাপ বেড়েছে। একই সঙ্গে মাদক পাচার, মানবপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধের মতো নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। তবে কিছু অপরাধী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের জন্য পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা যুক্তিসঙ্গত নয়; অধিকাংশ রোহিঙ্গাই নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় থাকা নির্যাতিত মানুষ।

সাম্প্রতিক কূটনৈতিক অগ্রগতি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা দেখায়, কেবল রাজনৈতিক ঘোষণা যথেষ্ট নয়; সফল প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজন মিয়ানমারের বাস্তব রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আঞ্চলিক দেশগুলোর সহযোগিতা, জাতিসংঘের সক্রিয় ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক চাপ। রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সমস্যা হিসেবে দেখলে এর পূর্ণ বাস্তবতা বোঝা যায় না। এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৌশলগত রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত রাখাইন রাজ্য ভারত মহাসাগর, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় চীন, ভারত, আসিয়ান এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ হ্যান্স জে. মরগেনথাউ যথার্থই বলেছেন, “International politics, like all politics, is a struggle for power.” অর্থাৎ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মানবিক মূল্যবোধের পাশাপাশি কৌশলগত স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

চীনের জন্য রাখাইনের গুরুত্ব মূলত কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর ও চীন–মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরকে ঘিরে। এই করিডর বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে চীনের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করেছে এবং মালাক্কা প্রণালীর ওপর নির্ভরতা কমানোর কৌশলগত সুযোগ দিয়েছে। অন্যদিকে ভারতের কালাদান মাল্টি-মোডাল ট্রানজিট প্রকল্প উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বিকল্প যোগাযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে উভয় দেশই রাখাইনে স্থিতিশীলতা চাইলেও তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থও এখানে জড়িত। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো রোহিঙ্গা সংকটকে মূলত মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে দেখেছে। তারা মিয়ানমারের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বিচার প্রক্রিয়াকে সমর্থন করেছে। তবে এসব উদ্যোগ এখনো কার্যকর প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি করতে পারেনি, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতির সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরে।

রোহিঙ্গা সংকটের পেছনে কোনো পরাশক্তির পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের বিষয়ে এখন পর্যন্ত জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আদালত বা গবেষণায় নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে রাখাইনের কৌশলগত অবস্থান, সমুদ্রবন্দর ও জ্বালানি করিডরের কারণে বিশ্বশক্তিগুলোর আগ্রহ অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই ভূরাজনৈতিক স্বার্থকে সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা যায়, কিন্তু একমাত্র কারণ হিসেবে নয়।

বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধ। সামরিক বাহিনী ও বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাতে রাখাইনের অনেক অঞ্চল এখনো অস্থিতিশীল। ফলে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—রোহিঙ্গারা ফিরে গেলে তাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, ভূমির অধিকার ও মৌলিক সেবা নিশ্চিত হবে কি না। এসব নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো প্রত্যাবাসন দীর্ঘস্থায়ী হবে না। সাম্প্রতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ভাঙার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা এবং মালয়েশিয়ার মধ্যস্থতায় মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা নতুন গতি পেয়েছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা যথেষ্ট নয়; বাস্তবায়নই হবে সাফল্যের মূল মানদণ্ড। 

২০১৮ ও ২০১৯ সালের প্রত্যাবাসন উদ্যোগ নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে সফল হয়নি। অধিকাংশ রোহিঙ্গা নিজ মাতৃভূমিতে ফিরতে চায়, তবে সেই প্রত্যাবর্তন হতে হবে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অধিকারভিত্তিক। তাদের নাগরিকত্ব, নিজ ভূমিতে বসবাসের অধিকার, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রয়োজন।

জাতিসংঘের অবস্থানও স্পষ্ট—প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছাসেবী, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই। বাস্তব প্রত্যাবাসন শুরু হলে নিবন্ধন, পর্যবেক্ষণ, পুনর্বাসন এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি মূল্যায়নে জাতিসংঘের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য হবে। বর্তমান উদ্যোগ সফল হলে এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক অর্জন হবে। এতে কক্সবাজার অঞ্চলের অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ কমবে এবং অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের পথ সহজ হবে। তবে তাড়াহুড়ো নয়; আন্তর্জাতিক আইন, জাতিসংঘের সম্পৃক্ততা এবং মিয়ানমারের সুস্পষ্ট রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ভিত্তিতেই এই প্রক্রিয়া পরিচালনা করতে হবে।

রোহিঙ্গা সংকট প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশের জন্য মানবিক সহমর্মিতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জাতীয় নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক প্রজ্ঞার এক কঠিন পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুরু থেকেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে স্মরণ করিয়ে দিয়ে আসছে যে, এই সংকটের উৎপত্তি বাংলাদেশের মাটিতে নয়; এটি মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বৈষম্য, নাগরিকত্ব সংকট এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিণতি। ফলে এর স্থায়ী সমাধানের প্রধান দায়িত্বও মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর বর্তায়। সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ যে মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে, তা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হলেও কোনো রাষ্ট্রের পক্ষেই অনির্দিষ্টকাল ধরে আরেক দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর দায়িত্ব বহন করা সম্ভব নয়।

সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা এই দীর্ঘ অচলাবস্থায় নতুন আশার সঞ্চার করেছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের উদ্যোগ, বাংলাদেশের ধারাবাহিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অংশীদারের সক্রিয় সম্পৃক্ততা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রশ্নে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা আমাদের সতর্ক করে দেয় যে কূটনৈতিক ঘোষণা যতই আশাব্যঞ্জক হোক না কেন, প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে তার বাস্তবায়নের ওপর। ২০১৮ ও ২০১৯ সালের ব্যর্থ প্রত্যাবাসন উদ্যোগ প্রমাণ করেছে যে নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হলে কোনো প্রত্যাবাসনই কার্যকর ও টেকসই হতে পারে না।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কৌশল তাই শুধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। জাতিসংঘ, আসিয়ান, ওআইসি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সম্পৃক্ত করে একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসনের প্রতিটি ধাপে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, সম্পত্তির অধিকার এবং মৌলিক মানবাধিকার বাস্তবে সংরক্ষিত হয়। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (UNHCR)-এর সক্রিয় তত্ত্বাবধান এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি ছাড়া একটি বৃহৎ প্রত্যাবাসন কার্যক্রম আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করবে না।

প্রত্যাবাসন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সহায়তার ধারাবাহিকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক সংকটের কারণে দাতা দেশগুলোর মনোযোগ অন্যদিকে সরে গেলেও রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারের তালিকায় ধরে রাখতে বাংলাদেশকে আরও সক্রিয় জনকূটনীতি পরিচালনা করতে হবে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারণী মহলের সামনে তথ্য-উপাত্তসহ তুলে ধরতে হবে যে, বাংলাদেশ শুধু মানবিক দায়িত্বই পালন করছে না; একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও সামাজিক চাপও বহন করছে।

এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থানীয় জনগণের স্বার্থ রক্ষা। কক্সবাজার, টেকনাফ ও ভাসানচরের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশগত ক্ষতি, অবকাঠামোগত চাপ এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রভাব মোকাবিলা করছে। তাই রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি স্বাগতিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, পরিবেশ পুনরুদ্ধার এবং অবকাঠামো উন্নয়নকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা আরও জোরদার করে মাদক পাচার, মানবপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে হবে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে নিরীহ শরণার্থীদের মানবিক অধিকার যেন ক্ষুণ্ন না হয়, সে বিষয়েও সমান সতর্ক থাকতে হবে।

রোহিঙ্গা সংকটকে কেবল মানবিক সমস্যা হিসেবে নয়, আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবেও উপস্থাপন করা প্রয়োজন। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সহযোগিতা, বিমসটেক, আসিয়ান এবং অন্যান্য আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশ আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ এই সংকটের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব শুধু বাংলাদেশ বা মিয়ানমারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

পরিশেষে বলা যায়, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের সমস্যা নয়; তারা মিয়ানমারের নাগরিক, যারা দীর্ঘদিন ধরে বৈষম্য, সহিংসতা ও রাষ্ট্রহীনতার শিকার। বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়ে মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এখন দায়িত্ব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের—মিয়ানমারের ওপর কার্যকর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে রোহিঙ্গারা নিরাপদে, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদার সঙ্গে নিজ মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে পারে। কারণ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রকৃত সাফল্য কোনো যৌথ বিবৃতি বা কূটনৈতিক ঘোষণায় নয়; বরং তখনই অর্জিত হবে, যখন একজন রোহিঙ্গা নিজ দেশে ফিরে ভয়ের পরিবর্তে নিরাপত্তা, রাষ্ট্রহীনতার পরিবর্তে নাগরিকত্ব এবং অনিশ্চয়তার পরিবর্তে একটি মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা লাভ করবে। যদি সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়, তবে সেটি শুধু বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিজয় হবে না; বরং আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং বৈশ্বিক মানবিক মূল্যবোধেরও এক গুরুত্বপূর্ণ বিজয় হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেবে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
Mizan12bd@yahoo.com