চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা থামছেই না

প্রচার প্রচারণা দিয়ে কোনোভাবেই চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা থামছে না। এতে যাত্রীরা হারাচ্ছেন দৃষ্টিশক্তি, ভাঙছে হাড়, ঘটছে মৃত্যুও। রেলওয়ে পুলিশের দাবি, অধিকাংশ ঘটনায় জড়িত স্কুলপড়ুয়া শিশু-কিশোররা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সন্তানকে নিবৃত্ত করতে ব্যর্থ অভিভাবকদের আইনের আওতায় আনার বিষয়টিও ভাবছে রেলওয়ে পুলিশ।

উল্লেখ্য, রেলওয়ে আইনের ১২৭ ধারা অনুযায়ী, ট্রেনে পাথর ছোড়া হলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান আছে। ৩০২ ধারা অনুযায়ী, পাথর নিক্ষেপে কারো মৃত্যু হলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। যদিও এসব আইনে কারো শাস্তির কোনো নজির নেই।

পাথর নিক্ষেপকে নিছক শিশুদের দুষ্টুমি: রেলওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজি ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান  জানিয়েছেন, পাথর নিক্ষেপকে নিছক শিশুদের দুষ্টুমি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রথম বার কোনো শিশুকে ধরা হলে তার অভিভাবককে ডেকে মুচলেকা নেওয়া হবে। এরপরও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে অভিভাবকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এক পাথরে অন্ধকার সাব্বিরের ভবিষ্যৎ: সর্বশেষ গত ২১ জুলাই সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া ও জামতৈল রেলস্টেশনের মধ্যবর্তী এলাকায় দ্রুতযান এক্সপ্রেসে ছোড়া পাথরে ডান চোখে গুরুতর আঘাত পান ২২ বছর বয়সি সাব্বির হোসেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার চোখের নিচের হাড় ভেঙে গেছে এবং দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। একটি পাথর এভাবেই অন্ধকার করে দিয়েছে এক তরুণ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। পঞ্চগড় থেকে ঢাকাগামী ট্রেনটির যাত্রী সাব্বির বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। ঘটনার পর তাকে কামারখন্দ উপজেলার জামতৈল রেলওয়ে স্টেশনে নামিয়ে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তী সময়ে হাড়ের অস্ত্রোপচারের জন্য তাকে জাতীয় নাক, কান ও গলা ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়।

চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে সাব্বিরের বাবা দুলাল হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, অস্ত্রোপচারের জন্য প্রায় দেড় লাখ টাকা প্রয়োজন। সন্তানের চোখের আলো হারানোর আশঙ্কার পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যয় নিয়েও এখন দিশেহারা পরিবারটি।

সাব্বিরের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। ২৩ জুন দিবাগত রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে চট্টগ্রামগামী তূর্ণা এক্সপ্রেস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তালশহর স্টেশন অতিক্রম করার সময় ট্রেনটিকে লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। এ সময় একটি পাথর ট্রেনের ভেতরে থাকা আয়কর আইনজীবী শ্যামল চন্দ্র দাসের ডান চোখে আঘাত হানে। অপরদিকে, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী মহানগর এক্সপ্রেস ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ে স্টেশনের আউটার পৈরতলা এলাকায় আসলে ঢাকার স্বপ্ন কুটির বিল্ডার্সের নির্বাহী হিসাব রক্ষক নাইমুল হাসান আঘাতপ্রাপ্ত হয়। গত ৩ জুন শ্রীমঙ্গল থেকে ঢাকাগামী পারাবত এক্সপ্রেস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাছাকাছি পৌঁছালে বাইরে থেকে ছোড়া পাথরে এক শিশু যাত্রী আহত হয়। পাথরটি তার পেটে আঘাত করে। এর আগে ১৭ মে একই ট্রেনে পাথর নিক্ষেপে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের চিকিত্সক এম এ বি ছিদ্দিক মজুমদার কপালে আঘাত পান। অল্পের জন্য তার চোখ রক্ষা পায়। গত ৩০ এপ্রিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শহরগামী শাটল ট্রেনে পাথর নিক্ষেপে লোকোমাস্টার মো. ওমর ফারুক মাথায় আঘাত পান। ২৭ এপ্রিল কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী কক্সবাজার এক্সপ্রেসে পাথর নিক্ষেপে আহত হন দুই যাত্রী। তাদের একজন মোহাম্মদ হিমেল আহমেদের চারটি দাঁত ভেঙে যায় এবং ঠোঁটের ভেতরের অংশ ফেটে যায়। অপর যাত্রী মোহাম্মদ আবু সাঈদ ঘাড়ে আঘাত পান।

পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই: চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা নিয়ে কোনো একক সংস্থার কাছে সুনির্দিষ্ট ও বছরভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার নেই। ফলে প্রকৃত ঘটনা, আহত ও নিহতের সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। রেলওয়ে সূত্রের হিসাবে, গত এক বছরে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় অর্ধশতাধিক যাত্রী আহত হয়েছেন। গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন সময়ে প্রায় দুই হাজার ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করা হয়েছে। এতে ট্রেনের দরজা-জানালা ভাঙার পাশাপাশি বহু যাত্রী গুরুতর আহত হয়েছেন। কোনো কোনো ঘটনায় মৃত্যুও হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন সময়ের প্রতিবেদনে বছরে গড়ে ১৫০ থেকে ২০০টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়। সে হিসেবে গত ১০ বছরে এমন ঘটনার সংখ্যা দেড় হাজার থেকে দুই হাজারের কাছাকাছি হতে পারে।

নিক্ষেপ রোধে রেলওয়ের পরিকল্পনা: পাথর নিক্ষেপপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া, নিক্ষেপের স্থানভিত্তিক তথ্য অতিরিক্ত আইজিপিকে (জিআরপি) পত্র মারফত জানানো, কক্সবাজার লাইনে প্রচারপত্র বিতরণ এবং প্রতিরোধের জন্য স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিকে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ রেলওয়ের মাসিক পরিচালন পর্যালোচনা সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন এতে সভাপতিত্ব করেন। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ এবং এসিপি, এসি ও সিগন্যালিংয়ের যন্ত্রাংশ চুরিসহ সব ধরনের চুরি ও ছিনতাই প্রতিরোধে জিআরপি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। পাথর নিক্ষেপের ঘটনা সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাকে অবহিত করতে বলা হয়। এসব ঘটনায় জিআরপি আইনগত ব্যবস্থা নেবে। সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয়, পাথর নিক্ষেপপ্রবণ এলাকায় সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) তার অধিকক্ষেত্রে পাথর নিক্ষেপ-সংক্রান্ত তথ্য সম্বলিত পত্র পাঠাতে হবে।