চার প্রকার ধর্মীয় জ্ঞান শিক্ষা করা সবার জন্য ফরজ

মানবজীবনের উৎকর্ষ সাধন ও সফলতা অর্জনের মূল চাবিকাঠি হলো ধর্মীয় জ্ঞান। ইসলামে জ্ঞানার্জনকে ফরজ বা আবশ্যিক কর্তব্য করা হয়েছে। যেখানে ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব, সেখানে অজ্ঞতা, কুসংস্কার এবং নানা ভ্রষ্টতা বাসা বাঁধে।

ফলে মানুষ ইহকাল ও পরকাল—উভয় জগৎই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ জন্য মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২২৪)

কোরআনে জ্ঞানার্জনের নির্দেশ

অজ্ঞতা মানবজাতির জন্য এক মহা অভিশাপ। এটি মানুষকে পশুর স্তরে নামিয়ে দেয় এবং দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জায়গাতেই লাঞ্ছিত করে। এ জন্যই পবিত্র কোরআনের প্রথম নির্দেশই ছিল, ‘পড়ো তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা আলাক, আয়াত : ১)

ইসলামি পরিভাষায় ধর্মীয় জ্ঞান দুই ভাগে বিভক্ত—

১. ফরজে আইন, যা শেখা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য বাধ্যতামূলক।

২. কিফায়াহ বা সমষ্টিগত ফরজ, যা সবার জন্য ফরজ নয়। এলাকার কেউ একজন শিখলে ওই স্থানের অন্যান্য বাসিন্দার ওপর তা আবশ্যক থাকে না। (ইবনে আব্দিল বার, জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাদলিহি, ১/৫৭, দারু ইবনিল জাওযি, সৌদি আরব, ১৯৯৪)

ফরজে আইনের পরিচয়

ফরজে আইনমূলক জ্ঞান সম্পর্কে সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন আল্লামা ইবনুল কাইয়িম (রহ.)। তিনি বলেন, ফরজে আইন প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ব্যক্তিগতভাবে ফরজ, যা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা কারোর জন্যই বৈধ নয়। এটি কয়েক প্রকারে বিভক্ত।

প্রথম প্রকার

ইমানের মৌলিক পাঁচটি বিষয়ের জ্ঞান। আল্লাহ, তার ফেরেশতাগণ, তার কিতাবসমূহ, তার রাসুলগণ এবং শেষ দিবসের (কেয়ামত) প্রতি ইমান আনা। কারণ, যে ব্যক্তি এই পাঁচটি বিষয়ের বিশ্বাস ছাড়া কেউ ইমানের সীমানায় প্রবেশ করতে পারে না এবং তাকে মুমিনও বলা যায় না।

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘বরং সৎকর্মশীল তো সে-ই, যে ইমান আনে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাদের প্রতি এবং কিতাবসমূহ ও নবীগণের প্রতি...।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৭৭)

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ, ইমান আনো আল্লাহর প্রতি, তাঁর রাসুলের প্রতি, যে কিতাব তার রাসুলের ওপর নাজিল করেছেন, তার প্রতি এবং যে কিতাব তার আগে নাজিল করেছেন, তার প্রতি। যে ব্যক্তি আল্লাহকে, তার ফেরেশতাগণকে, তার কিতাবসমূহকে, তার রাসুলগণকে এবং পরকালকে অস্বীকার করে, সে পথভ্রষ্ট হয়ে অনেক দূরে সরে গেছে।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৩৬)

ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) যখন নবীজিকে ইমান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন, তখন তিনি উত্তরে বলেছেন, ‘তুমি ইমান আনবে আল্লাহ, তার ফেরেশতাগণ, তার কিতাবসমূহ, তার রাসুলগণ এবং শেষ দিবসের প্রতি।’

নবীজির উত্তর শুনে জিবরাইল বললেন, ‘আপনি সত্য বলেছেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৮)

সুতরাং এই মূলনীতিগুলোর ওপর ইমান আনা নির্ভর করে এগুলোর পরিচিতি এবং এ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের ওপর।

দ্বিতীয় প্রকার

ইসলামি শরিয়তের বিধানাবলির জ্ঞান। এর মধ্যে অত্যাবশ্যকীয় হলো বান্দার নিজের আমল–সম্পর্কিত জ্ঞান, যেমন অজু, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত এবং এগুলোর আনুষঙ্গিক বিষয়, শর্তাবলি ও বিনষ্টকারী বিষয়াবলির জ্ঞান।

তৃতীয় প্রকার

পাঁচটি হারাম বা নিষিদ্ধ বিষয়ের জ্ঞান, যা পূর্ববর্তী রাসুলগণের শরিয়ত ও আসমানি কিতাবসমূহেও নিষিদ্ধ ছিল। আল্লাহ–তাআলা কোরআনের মাধ্যমে সেসব বিষয় আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। 

আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘আপনি বলে দিন, আমার প্রতিপালক তো হারাম করেছেন অশ্লীল কাজসমূহ—প্রকাশ্য হোক বা গোপন এবং সর্বপ্রকার পাপ, অন্যায়ভাবে (কারও প্রতি) সীমালঙ্ঘন, আল্লাহ যে সম্পর্কে কোনো প্রমাণ অবতীর্ণ করেননি, এমন জিনিসকে আল্লাহর শরিক সাব্যস্তকরণ এবং আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কথা বলা, যে সম্পর্কে তোমাদের বিন্দুমাত্র জ্ঞান নেই।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ৩৩)

এই বিষয়গুলো সর্বাবস্থায় হারাম। পূর্ববর্তী সব রাসুলের শরিয়তেই এবং প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই সম্পূর্ণ হারাম ছিল। এগুলো কখনোই কারও জন্য হালাল করা হয়নি।

এ জন্যই আয়াতে সীমাবদ্ধতা বোঝাতে ‘ইননামা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। অপর দিকে অন্য কিছু বিষয় আছে, যেগুলো একসময় হারাম হলেও অন্য সময়ে হালাল করা হয়। (যেমন চরম বিপৎকালে মৃত প্রাণী, রক্ত ও শূকরের গোশত খাওয়া)।

তাই সেগুলো চিরন্তন হারামের তালিকা অন্তর্ভুক্ত নয়।

চতুর্থ প্রকার

মানুষে-মানুষে যে সামাজিক মেলামেশা ও লেনদেন (মুআ’মালাত-মুআশারাত) সংগঠিত হয়, সেগুলোর বিধান–সম্পর্কিত জ্ঞান। অবশ্য এ ক্ষেত্রে আবশ্যকতার মাত্রা মানুষের অবস্থা ও মর্যাদার ভিন্নতার কারণে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।

যেমন প্রজার সঙ্গে শাসকের দায়িত্ব আর পরিবারের ও প্রতিবেশীর সঙ্গে একজন সাধারণ মানুষের দায়িত্ব এক নয়।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যে ব্যক্তি বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায় নিয়োজিত, তার ওপর বেচাকেনার বিধান–সংক্রান্ত জ্ঞান শেখা যতটুকু ফরজ, যে ব্যক্তি নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্ত কেনাবেচা করে না, তার ওপর ততটুকু ফরজ নয়।

তারপর তিনি বলেন, ‘এই সংক্ষিপ্ত আলোচনার বিস্তারিত ব্যাখ্যা কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আঁটানো সম্ভব নয়। কারণ, আবশ্যকীয় জ্ঞান অর্জনের কারণগুলো মানুষের অবস্থাভেদে আলাদা হয়ে থাকে। এর মূল বিষয়ের ৩টি মূলনীতি রয়েছে:

১. বিশ্বাসগত জ্ঞান; ২. কর্মগত জ্ঞান এবং ৩. বর্জনগত জ্ঞান।

আকিদার ক্ষেত্রে আবশ্যক জ্ঞান হলো, তা যেন বাস্তব সত্যের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে মিলে যায়। কর্মের ক্ষেত্রে আবশ্যক জ্ঞান হলো, বান্দার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ যাবতীয় ইচ্ছাকৃত আমল বা কাজকে যেন শরিয়তের আদেশ ও হালাল সীমা অতিক্রম না করে।

আর বর্জনের ক্ষেত্রে আবশ্যক জ্ঞান হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পাপ থেকে বিরত থাকা এবং তাতে স্থিরতা অর্জন করা। (ইবনুল কাইয়িম আল-জাওযিয়াহ, মিফতাহু দারিস সাআ’দাহ ওয়া মানশুরি বিলায়াতুল ইলমি ওয়াল ইরাদাহ, ১/১৬১-১৬২, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৮)