জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বাস্তবায়নাধীন ‘টেকসই ক্ষুদ্রাকার পানি সম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় কানমনা-হারাবতী খাল পুনঃখননে দুই দফায় ১ কোটি ৮২ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী মোট কাজের অন্তত ৫০ শতাংশ কাজ শ্রমিকের হাতে সম্পন্ন করার বাধ্যতামূলক শর্ত থাকলেও তা পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। স্থানীয় গরিব দিনমজুরদের কর্মসংস্থান থেকে বঞ্চিত করে নথিতে ১৮০ জন শ্রমিক দিয়ে কাজ দেখানো হলেও ৬টি এক্সকাভেটর (ভেকু) মেশিন দিয়ে দিনে-রাতে চালানো হয়েছে খননকাজ।
প্রকল্পটির বাস্তবায়ন করছে স্থানীয় কানমনা-হারাবতী পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতি লিমিটেড।
উপজেলা এলজিইডি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কানমনা-হারাবতী খালের রোয়াইর সুইচগেট থেকে বানদীঘি গ্রাম পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার অংশ পুনঃখননের জন্য ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রথম দফায় ১ কোটি ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ প্রকল্পটির উদ্বোধন করা হয়।
পরে একই খালের আরও ৫ দশমিক ৯০৫ কিলোমিটার অংশ পুনঃখননের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দ্বিতীয় দফায় ৭১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে কানমনা খালের ৪ হাজার ৬৮০ মিটার অংশের প্রাক্কলিত ব্যয় ৫৩ লাখ ৩৪ হাজার ১৫০ টাকা এবং হারাবতী খালের ১ হাজার ২২৫ মিটার অংশের প্রাক্কলিত ব্যয় ১৭ লাখ ৮০ হাজার ৯২০ টাকা। চলতি বছরের ১৫ মার্চ কাজ শুরু হয়ে ৩১ মে শেষ হওয়ার কথা ছিল।
এলজিইডির অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী খালের নির্ধারিত গভীরতা, তলার প্রস্থ ও ওপরের প্রস্থ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হলেও সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ, সেই নকশা অনুযায়ী কাজের প্রতিফলন পাওয়া যায়নি।
মাত্রাই মুন্নাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, ইস্টিমেট অনুযায়ী কাজের বিন্দুমাত্রও হয়নি। খালের কিছু উঁচু জায়গার মাটি কেটে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু পুরো খাল সমানভাবে খনন করা হয়নি। শুধু পাড়ের ঘাস কেটে ঢালু করা হয়েছে। আবার কোনো টেন্ডার ছাড়াই দুই পাড়ের বড় বড় গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।
একই গ্রামের বাসিন্দা মোনোয়ার হোসেনের অভিযোগ, কোটি টাকার প্রকল্প হলেও মাঠে তার কোনো বাস্তব প্রতিফলন নেই। ভেকু দিয়ে কাজ করায় স্থানীয় গরিব শ্রমিকরা কাজ পাননি। দায়সারাভাবে কাজ করায় প্রথম বর্ষাতেই খাল আবার ভরাট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য ছিল স্থানীয় দরিদ্র শ্রমিকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা নিরসন। তবে স্থানীয়দের দাবি, শ্রমিক নিয়োগ না দিয়ে ছয়টি ভেকু মেশিন দিয়ে দ্রুত কাজ শেষ করা হয়েছে।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সমিতির এক সদস্য এবং এলজিইডির একটি দায়িত্বশীল সূত্র দাবি করেছে, প্রকল্পে বাস্তবে শ্রমিক নিয়োগ না হলেও কাগজে-কলমে ১৮০ জন নারী-পুরুষ শ্রমিকের তালিকা তৈরি করে বিল উত্তোলনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে এ দাবির স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
প্রকল্পে শ্রমিক ব্যবহার না করার বিষয়টি স্বীকার করেছেন প্রকল্পের তদারকি কর্মকর্তা ও এলজিইডির সহকারী প্রকৌশলী আবু জাফর। তিনি বলেন, প্রকল্পে শ্রমিক ব্যবহার করা হয়নি। ছয়টি ভেকু মেশিন দিয়ে কাজ হয়েছে। আমি কয়েকবার পরিদর্শনে গিয়ে কাজ দেখেছি। ঠিকাদারকে ইতোমধ্যে ৫৫ শতাংশ বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কানমনা-হারাবতী পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মফিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, সরকারি নির্দেশনা ও অনুমোদিত নকশা অনুসারেই কাজ হয়েছে। স্থানীয় বাস্তবতার কারণে সামান্য কিছু স্থানে সমন্বয় করা হয়েছে। ভেকু ও শ্রমিক উভয়ের সমন্বয়ে কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ সঠিক নয়।
এ বিষয়ে কালাই উপজেলা প্রকৌশলী সুমন কুমার দেবনাথ বলেন, কাজ শেষে ‘পোস্ট ওয়ার্ক’ মেজারমেন্টের মাধ্যমে পরিমাপ করে বিল পরিশোধ করা হবে। যেখানে কম কাজ হবে, সেখানে বিলও কম দেওয়া হবে। শ্রমিকের তালিকা উপজেলা কার্যালয়ে নেই; তা নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।