চট্টগ্রামের রাউজানে আলোচিত যুবদল নেতা মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদ হত্যা মামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া আরও দুই এজাহারভুক্ত আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। গ্রেপ্তারদের তথ্যের ভিত্তিতে রাউজান থেকে একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন ও ৭ দশমিক ৬৫ ক্যালিবারের দুই রাউন্ড গুলিও উদ্ধার করা হয়েছে।
সোমবার (৩ আগস্ট) সকালে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম।
এ নিয়ে মামলার মোট ছয়জন এজাহারভুক্ত আসামিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পুলিশ জানায়, গত শনিবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে সীতাকুণ্ড থানার শীতলপুর এলাকায় শাহ আমিন উল্লাহ ফিলিং স্টেশনের সামনে স্থাপিত বিশেষ চেকপোস্টে অভিযান চালিয়ে মামলার এজাহারভুক্ত আসামি এবং আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত মো. দিদার আলম (৩০) ও মো. আফসার মিয়াকে (৩০) গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার দিদার আলম রাউজান সদর ইউনিয়নের পূর্ব রাউজান শমশেরনগর বেপারীপাড়ার শাহাব উদ্দিনের ছেলে। অপর আসামি আফসার মিয়াও একই এলাকার বেপারীপাড়ার মৃত অছিউর রহমানের ছেলে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, দিদার আলমের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১০টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। একই ধরনের অভিযোগে আফসার মিয়ার বিরুদ্ধে ৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, গ্রেপ্তারদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রোববার দিবাগত রাতের প্রথম প্রহরে রাউজান থানার ৭ নম্বর রাউজান ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব রাউজান (জুরুলকুল) এলাকার আমির হোসেন ফকির বাড়ির মানিকের বসতঘরের পেছনে সেফটি ট্যাংকসংলগ্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়। এ সময় মাটির নিচে পুঁতে রাখা একটি সাদা প্লাস্টিকের বস্তার ভেতর পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন এবং ৭ দশমিক ৬৫ ক্যালিবারের দুই রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া অস্ত্রটির উৎস, এটি কার হেফাজতে ছিল এবং কোনো অপরাধে ব্যবহৃত হয়েছে কি না, তা জানতে অস্ত্রটি পরীক্ষার পাশাপাশি ফরেনসিক বিশ্লেষণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে অন্য কোনো ব্যক্তি পলাতক রয়েছে কি না এবং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের সঙ্গে এ ঘটনার যোগসূত্র রয়েছে কি না, তাও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ১৩ জুন দুপুরে রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাকসুদুল হক চৌধুরী মাসুদকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পরে অস্ত্র উঁচিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ঘটনাস্থল ত্যাগ করে তারা। এ ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
ঘটনার প্রায় ৬০ ঘণ্টা পর নিহতের বড় ভাই ও বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান পেয়ারুল হক চৌধুরী স্বপন বাদী হয়ে রাউজান থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় কারাগারে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী ছোট সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী মোহাম্মদ রায়হানকে প্রধান আসামি করে ১১ জনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও সাত থেকে আটজনকে আসামি করা হয়।
ঘটনার পর ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজে গ্রেপ্তার দিদার আলম, আফসার মিয়াসহ একাধিক ব্যক্তিকে হত্যাকাণ্ডে অংশ নিতে দেখা যায়। এ মামলায় এর আগে ঢাকা থেকে মো. ইলিয়াস ওরফে ধামা ইলিয়াস, রাঙ্গামাটি থেকে মো. আইয়ুব, হত্যার পর নিহতের প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগ নিয়ে যাওয়া রায়হান এবং ঘটনাস্থলের পাশের চায়ের দোকানদার জাগের হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের পরপরই মামলার রহস্য উদঘাটনে বিশেষ তদন্ত শুরু হয়। ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, প্রযুক্তিগত তথ্য, মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হয়। তদন্তের ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন স্থানে নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করা হয়।
ডিবি পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও অনুসন্ধানে গ্রেপ্তার দুই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও আশপাশের এলাকায় সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত একাধিক আলোচিত অপরাধেও তাদের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে বলে জানানো হয়।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, খুন, সন্ত্রাস, অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গোয়েন্দা তথ্যভিত্তিক অভিযান, প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান এবং পেশাদার আভিযানিক কার্যক্রম ভবিষ্যতেও আরও জোরদার করা হবে।