বাংলাদেশের নির্মাণ ও ইন্টেরিয়র ডিজাইন সেক্টরে নকশা, পরিকল্পনা ও নির্মাণকাজ যতটা সময়োপযোগী হয়েছে, নির্মাণসামগ্রী কেনার প্রক্রিয়াটি এখনও সে তুলনায় পুরোনো পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল। প্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য একের পর এক সরবরাহকারীকে ফোন করা, হোয়াটসঅ্যাপে কোটেশন নেওয়া, দাম নিয়ে দর-কষাকষি, পণ্যের নমুনা সংগ্রহ, সরবরাহকারীর সঙ্গে বারবার যোগাযোগ—সব মিলিয়ে প্রকিউরমেন্ট প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ ও জটিল।
এই বাস্তবতাকে কাছ থেকে দেখেছেন তরুণ স্থপতি নুজহাত শামা। স্থাপত্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করা ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনের পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বুঝেছেন, নির্মাণকাজে প্রকিউরমেন্ট ম্যানেজমেন্টে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে সময়, শ্রম ও অর্থ—তিনটিই সাশ্রয় করা সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই চাকরি ছেড়ে উদ্যোক্তা হওয়ার পথে হাঁটেন তিনি। তবে তার উদ্যোগ কোনো প্রচলিত স্থাপত্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নয়। বরং স্থপতি, নির্মাতা, ঠিকাদার, ডেভেলপার, ইন্টেরিয়র ডিজাইনার থেকে শুরু করে ব্যক্তিগতভাবে বাড়ি নির্মাণে আগ্রহী মানুষের নির্মাণ উপকরণ কেনার প্রক্রিয়াকে সহজ করতে তিনি তৈরি করেছেন ‘প্রো-কিউ’ (ProQ) নামের একটি ডিজিটাল প্রকিউরমেন্ট প্ল্যাটফর্ম।
২০২২ সালে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি থেকে স্থাপত্যে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন নুজহাত শামা। দারুণ ফলাফলের জন্য ভিসি এবং ডিন'স লিস্টে ছিলেন। এরপর একই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ আর্কিটেকচার অ্যান্ড আরবানিজম-এ গবেষণা সহকারী হিসেবে কাজ করেন কিছুদিন। পরে যোগ দেন র্যানকন ডেভেলপমেন্টসে। সেখানে বিভিন্ন প্রকল্পের স্থাপত্য নকশা ও ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি।
পেশাগত কাজ করতে গিয়েই নির্মাণ উপকরণ সংগ্রহের নানা জটিলতা তাকে ভাবায়। একটি প্রকল্পে প্রয়োজনীয় উপকরণের জন্য একাধিক সরবরাহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ, কোটেশন সংগ্রহ, দাম যাচাই, দর-কষাকষি, নমুনা দেখা এবং শেষ পর্যন্ত সঠিক পণ্য ও পরিমাণ নিশ্চিত করা—পুরো প্রক্রিয়াটিই অনেক সময় ডিজাইনের কাজের চেয়েও বেশি সময় নিয়ে নেয়। অথচ সেই সময়টা ডিজাইনের পেছনে ব্যয় করা গেলে ডিজাইনকে আরও সৃজনশীল, নান্দনিক ও সুচারু উপায়ে সম্পন্ন করা সম্ভব।
বিশেষ করে ফোনকল ও হোয়াটসঅ্যাপনির্ভর যোগাযোগে তথ্য হারিয়ে যাওয়া, কোটেশনের পরিবর্তন, পণ্যের স্পেসিফিকেশন নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি কিংবা সরবরাহের পর পণ্য প্রত্যাশা অনুযায়ী না পাওয়ার মতো সমস্যাও দেখা যায়। নুজহাত উপলব্ধি করলেন, এই পুরো প্রক্রিয়াকে একটি নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসা প্রয়োজন।
এই সমস্যার সমাধান হিসেবেই তৈরি হয়েছে প্রো-কিউ। প্ল্যাটফর্মটির মূল ধারণা সহজ—একজন ক্রেতাকে প্রয়োজনীয় নির্মাণ উপকরণের জন্য আলাদা আলাদা সরবরাহকারীকে ফোন করে কোটেশন চাইতে হবে না। সবধরনের পণ্য প্রদর্শিত হবে একটি ওয়েবসাইটে। বিক্রেতারা পৃথক প্রোফাইলের মাধ্যমে সেগুলোর তালিকা সাজাবেন। স্থপতি, ইন্টেরিয়র ডিজাইনার, বা যেকোনো সাধারণ ক্রেতারাও শো-রুম ঘুরে দেখার পরিবর্তে ওয়েবসাইট থেকেই প্রতিটি প্রোডাক্টের আদ্যোপান্ত জানার পাশাপাশি থ্রিডি মডেলও সংগ্রহ করতে পারবেন।
পণ্য কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতা একটি প্রকিউরমেন্ট রিকোয়েস্ট তৈরি করে প্রয়োজনীয় পণ্যের নাম, পরিমাণ, স্পেসিফিকেশন ও প্রকল্পসংক্রান্ত তথ্য দিতে পারবেন। এরপর সংশ্লিষ্ট বিক্রেতারা তাদের কোটেশন জমা দেবেন। ক্রেতা একই জায়গায় একাধিক অফার পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। এতে দর-কষাকষির সুযোগ যেমন থাকছে, তেমনি আলোচনার প্রতিটি ধাপও ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকবে।
প্রকিউরমেন্টে সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু সঠিক দামে পণ্য পাওয়া নয়; বরং অর্ডার দেওয়ার পর পণ্যটি চুক্তি অনুযায়ী পাওয়া যাচ্ছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এ জায়গাতেও প্রো-কিউ জোর দিচ্ছে। এছাড়া যোগ্য লেনদেনের ক্ষেত্রে প্ল্যাটফর্মটিতে রয়েছে বায়ার প্রোটেকশন পলিসি। অর্থাৎ অর্ডার সম্পন্ন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থ ছাড়ের পরিবর্তে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় লেনদেন পরিচালিত হয়। সরবরাহ করা পণ্য স্পেসিফিকেশনের সঙ্গে না মিললে বা নির্দিষ্ট কোনো সমস্যা দেখা দিলে ক্রেতার অভিযোগ উত্থাপন ও সমাধানের একটি প্রক্রিয়া থাকছে।
প্রো-কিউ শুধু ক্রেতাদের সমস্যা সমাধান করতে চায় না। দেশের অনেক ভালো নির্মাতা ও পরিবেশকের মানসম্পন্ন পণ্য থাকলেও ব্যক্তিগত যোগাযোগ, পরিচিতি ও নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বাজারের কারণে তাদের ব্যবসার পরিধি সীমিত থাকে। নতুন ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে বছরের পর বছর সম্পর্ক তৈরি করতে হয়। প্রো-কিউয়ের মাধ্যমে এসব বিক্রেতা এখন বড় পরিসরে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পাবেন। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান প্রো-কিউয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবং দেশের নির্মাণ ও ইন্টেরিয়র খাতের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার কার্যক্রম চলছে।
নুজহাত শামা নিজে যেহেতু স্থপতি, তাই তিনি প্রকিউরমেন্টের সমস্যাটি অন্য আট-দশজন উদ্যোক্তার দৃষ্টিতে দেখেননি; বরং একজন ব্যবহারকারী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। বাজার গবেষণা ও সম্ভাব্য ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আলাপচারিতার মাধ্যমে নানাধরনের সমস্যা চিহ্নিত করে সেই আলোকে প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করেছেন। বিশেষ করে পণ্যের মান, সরবরাহের ধারাবাহিকতা, নির্ভরযোগ্য বিক্রেতা খুঁজে পাওয়া এবং প্রতিশ্রুত পণ্য যথাযথভাবে পাওয়া—এসব বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ভাবছেন তিনি। তাই দ্রুত বড় হওয়ার চেয়ে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করাকেই প্রাথমিকভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন নুজহাত। প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার আগে বিক্রেতাদের যাচাই করার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
নুজহাত শামার যাত্রাটি তাই শুধু একজন স্থপতির উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প নয়। এটি নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে একটি বাস্তব সমস্যা শনাক্ত করে প্রযুক্তির মাধ্যমে তার সমাধান তৈরির গল্প। অনলাইনে www.proq.com.bd ঠিকানায় তার প্ল্যাটফর্মটি ভিজিট করা যাবে। চলছে শেষমুহূর্তের প্রস্তুতি। এরপর খুব শিগগিরই এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হবে বলে জানিয়েছেন নুজহাত শামা।