দেশের পুষ্টি সংকট মোকাবিলা এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় (ইউএইচসি) অগ্রগতি বেগবান করতে শক্তিশালী সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতার মাধ্যমে পুষ্টিকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় সম্পূর্ণরূপে অন্তর্ভূক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সোমবার (৪ আগস্ট) রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় পুষ্টি কার্যক্রম একীভূতকরণ শীর্ষক এক জাতীয় গোলটেবিল আলোচনায় তারা এ পরামর্শ দেন। ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ গোলটেবিল বৈঠকটি আয়োজন করে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মূলধারায় পুষ্টিকে অন্তর্ভুক্ত করার উপায় নিয়ে আলোচনা করতে এই অনুষ্ঠানে যোগ দেন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা এবং উন্নয়ন অংশীদার, জাতিসংঘ সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সুশীল সমাজ ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস.এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার প্রধান অতিথি হিসেবে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস। জনস্বাস্থ্য পুষ্টি বিশেষজ্ঞ সাইকা সিরাজ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এবং আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর এবং ম্যাক্স ফাউন্ডেশন দক্ষিণ এশিয়ার রিজিওনাল ডিরেক্টর ড. এটিএম তারিকুল ইসলাম।
ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার দেশের পুষ্টি নীতিমালার প্রচেষ্টার ত্রুটিগুলো তুলে ধরে বলেন, এই ধরনের উদ্যোগগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী সরকারি মালিকানার অভাব রয়েছে এবং এগুলো মূলত দাতা-চালিত হওয়ায় টেকসই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, আমরা অপুষ্টি ও খর্বকায়তা মোকাবিলায় সাফল্য অর্জন করেছি, যদিও অগ্রগতি ধীর। আমাদের একটি শক্তিশালী, সরকার-নেতৃত্বাধীন এবং সমন্বিত পদ্ধতি প্রয়োজন।
একটি স্বাস্থ্যকর বাংলাদেশ গড়ার সরকারি পরিকল্পনা তুলে ধরে ড. হায়দার একটি জীবনচক্র পদ্ধতির ওপর জোর দেন, যেখানে ব্যাপক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে নাগরিকরা জন্ম থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রতিরোধমূলক সেবা পাবে।
তিনি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য উপকেন্দ্রের পরিকল্পনার কথা ব্যাখ্যা করেন, যার প্রতিটিতে নয়জন কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী থাকবেন। তার মতে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সাফল্যের জন্য পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও খাদ্য সুরক্ষায় একটি আন্তঃখাতভিত্তিক পদ্ধতি অপরিহার্য।
অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস সমাজে বিদ্যমান অণুপুষ্টির ঘাটতির সঙ্গে রোগের সম্পর্ক তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে বর্তমানে ৭০ শতাংশ মৃত্যুই অসংক্রামক ব্যধির কারণে হয়। তিনি বলেন, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনি রোগের মতো দীর্ঘস্থায়ী সমস্যাগুলো এই ঘাটতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, কারণ গর্ভে পুষ্টি থেকে বঞ্চিত একটি শিশু প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় নেফ্রনের কার্যকারিতা হ্রাস এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগ বয়ে বেড়ায়।
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ ইউনুস আলী বলেন, স্বাস্থ্য পরিষেবার কেন্দ্রে পুষ্টিকে রাখার পরিবর্তে এটিকে প্রায়শই প্রান্তিক অবস্থানে রাখা হয়।
ইউনুস আলীর বক্তব্যের সূত্র ধরে জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক উপ-পরিচালক ডা. রওশন জাহান আক্তার আলো পুষ্টির ক্ষেত্রে ‘সোনালী ১,০০০ দিন’ অর্থাৎ গর্ভাবস্থার ২৭০ দিন এবং তার পরবর্তী দুই বছর -এর প্রতি অতিরিক্ত গুরুত্বারোপের কথা বলেন।
আইসিডিডিআর,বি’র নির্বাহী পরিচালক ডা. তাহমিদ আহমেদ বিশ্বব্যাপী পুষ্টি ও শিশু স্বাস্থ্য বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ব্যাপক ক্লিনিক্যাল গবেষণার মাধ্যমে আইসিডিডিআর,বি খর্বাকৃতির (স্টান্টিং) কারণ হিসেবে দুর্বল পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধিকে চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ড. ইকবাল কবির পুষ্টির জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বকে কীভাবে কার্যকর করা যায়, সরকারি-বেসরকারি প্ল্যাটফর্মকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের ভূমিকা কী—এই অমীমাংসিত প্রশ্নটি উত্থাপন করেন।
ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের অধ্যাপক কাওসার আফসানা বলেন, সিস্টেম-থিংকিং এবং সিস্টেমের সংযোগ অপরিহার্য। তিনি উল্লেখ করেন, পুষ্টি বর্তমানে স্বাস্থ্য, ওয়াশ, প্রারম্ভিক শিশু বিকাশ, পরিবেশ কতগুলো মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে বিভক্ত হয়ে, যে কারণে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সমান গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও আলোচনার বাইরে থেকে যায়।
মূল প্রবন্ধে সাইকা সিরাজ বলেন, একটি শক্তিশালী নীতি কাঠামো থাকা সত্ত্বেও পুষ্টি পরিষেবাগুলো খণ্ডিত রয়ে গেছে এবং আনুমানিক ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকারী সরকারি প্রোটোকলের বাইরে থাকা অনানুষ্ঠানিক ও বেসরকারি পরিষেবা প্রদানকারীদের কাছে যায়।
সমাপনী বক্তব্যে ড. এটিএম তারিকুল ইসলাম পুষ্টি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করার জন্য সরকারি খাত, বেসরকারি খাত এবং নাগরিক সমাজকে একত্রিত করার গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এনপিও—খাদ্য ও নিরাপত্তা বিভাগের ফারিয়া শবনম, গেইন-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. রুদাবা খন্দকার, ইউনিসেফ-এর পুষ্টি বিশেষজ্ঞ তাহমিনা ফেরদৌস, ব্র্যাক জেপিজিএসপিএইচ-এর শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগের উপ-পরিচালক ড. সান্থিয়া আইরিন, ম্যাক্স ফাউন্ডেশনের প্রোগ্রাম ডিজাইন ও কোয়ালিটি বিভাগের প্রধান কাজল এম এম আহিদুল ইসলাম, বপিঙ্ক-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর শিহাব উজ্জামান, গ্রামীণ হেলথটেক লিমিটেড (সুখী)-এর চিফ টেকনোলজি অফিসার ও চিফ বিজনেস অফিসার মোহাম্মদ সোলায়মান রাসেল, ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এন্টারপ্রাইজেস (আইডিই)-এর প্রোগ্রাম বিষয়ক সহযোগী পরিচালক মোহাম্মদ সোয়েব ইফতেখার এবং এসএমসি-এর পক্ষে এমএমএস প্রকল্পের টিম লিডার এ এস এম শহিদুল আলমও অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।