রোগপ্রতিরোধ-ব্যবস্থার আধুনিকায়ন সত্ত্বেও বাংলাদেশে হামের ন্যায় একপ্রকার প্রতিরোধযোগ্য ব্যাধির পুনরুত্থান ঘটিয়াছে। ইহার কারণে শিশুমৃত্যু ও সাধারণ মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ বাড়িয়াছে যাহা উদ্বেগজনক। সম্প্রতি বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) ও আন্তর্জাতিক রেডক্রস এবং রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের (আইএফআরসি) যৌথ জরিপে যে চিত্র উন্মোচিত হইয়াছে, তাহা কেবল দেশের জনস্বাস্থ্য অব্যবস্থাপনাকেই নির্দেশ করে না, বরং ইহাতে প্রান্তিক জনগণের আর্থসামাজিক ভঙ্গুরতার এক করুণ রূপ আমাদের সম্মুখে পরিস্ফুট হইয়া উঠে। দেশের ১২টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২ হাজার ৭৪৬টি পরিবারের উপর পরিচালিত উক্ত মূল্যায়নে দেখা গিয়াছে যে, হামে আক্রান্ত প্রতি ১০ পরিবারের মধ্যে ৯ পরিবারই (৮৯ শতাংশ) চিকিৎসার খরচ মিটাইতে গিয়া চরম ঋণগ্রস্ত হইয়া পড়িয়াছে। তাহা ছাড়া ৬১ শতাংশ পরিবার তাহাদের দীর্ঘদিনের জমানো সঞ্চয় সম্পূর্ণ নিঃশেষ করিয়া ফেলিয়াছে । জরিপভুক্ত ৭৮ শতাংশ পরিবার অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত, যাহাদের মাসিক আয় মাত্র ৬ হাজার হইতে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। দৈনিক আয়ের উপর নির্ভরশীল এই সকল নিম্ন আয়ের মানুষজন সন্তানের চিকিৎসার জন্য কাজে যাইতে না পারায় একদিকে আয় বন্ধ হইতেছে, অন্যদিকে চিকিৎসার বিপুল খরচে তাহারা ভিটামাটি ও সম্পদ বিক্রয়ে বাধ্য হইতেছেন (৪ শতাংশ) অথবা অনুদানের আশায় দ্বারস্থ হইতেছেন ।
চিকিৎসা চলাকালে অনেক শিশু জটিল নিউমোনিয়া, অপুষ্টি ও ডায়রিয়াতে আক্রান্ত হইয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইতেছে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনা মূল্যে হইলেও অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া, আনুষঙ্গিক ঔষধ ক্রয় ও প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল পরীক্ষার সিংহভাগ খরচ রোগীকে নিজের পকেট হইতেই বহন করিতে হয়। রংপুর হইতে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আসা এক হতদরিদ্র মাতার কেবল যাতায়াত ও পরীক্ষানিরীক্ষায় ৭০ হাজার টাকার অধিক ব্যয় হইবার উদাহরণ প্রমাণ করে, দেশ জুড়িয়া সরকারি স্বাস্থ্যসেবায় চরম ঘাটতি রহিয়াছে। এইদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ৪ আগস্ট ২০২৬ তারিখের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ হইতে এই পর্যন্ত বাংলাদেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৮৪৯ জন শিশু মারা গিয়াছে। তাহার মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু ৯৬ জন এবং হামের উপসর্গ লইয়া মৃত্যু ৭৫৩ জন । ইহা ছাড়া গতকাল শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নূতন করিয়া হামের উপসর্গ লইয়া আরো দুই শিশুর মৃত্যু হইয়াছে । এই সময়ে নিশ্চিত ও উপসর্গ মিলাইয়া মোট ১ হাজার ১৯ জন শিশু হামে আক্রান্ত হইয়াছে ।
প্রশ্ন উঠিতে পারে, এত উন্নত টিকাদান কর্মসূচি সত্ত্বেও কেন এইভাবে হাম ছড়াইয়া পড়িল এবং এখনো ইহা নিয়ন্ত্রণে আনা যাইতেছে না? ইহার মূলে রহিয়াছে প্রাথমিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার শিথিলতা। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় নিয়মিত বুস্টার ডোজ নিশ্চিতকরণে মাঠপর্যায়ে তদারকির অভাব, দুর্গম অঞ্চলে সচেতনতা ও টিকার সরবরাহে ঘাটতি এবং মহামারি-পরবর্তী স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্থবিরতাই এই ব্যাধি ছড়াইয়া পড়ার প্রধান কারণ । তদুপরি, সময়মতো রোগ নির্ণয় ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আনয়নে বিলম্ব ঘটাতে রোগ জটিল আকার ধারণ করিতেছে। এই মানবিক ও স্বাস্থ্যসংকট হইতে উত্তরণের নিমিত্ত রাষ্ট্রকে অবিলম্বে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে । যেমন—অবিলম্বে ঘোষণা দিয়া সরকারি সকল হাসপাতালে হামে আক্রান্ত রোগীদের যাবতীয় পরীক্ষা, ঔষধ, পথ্য এবং প্রয়োজনে জটিল রোগীদের যাতায়াত খরচ সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে প্রদান করিতে হইবে । জরিপের সুপারিশ অনুযায়ী অতিঝুঁকিপূর্ণ পরিবারসমূহকে নগদ আর্থিক সহায়তা ও খাদ্যসহায়তা প্রদান করিয়া সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করিতে হইবে । মাঠপর্যায়ে বাদ পড়া শিশুদের চিহ্নিত করিয়া পুনরায় বিশেষ টিকাদান অভিযান পরিচালনা করিতে হইবে এবং ওয়াশ (পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি) কার্যক্রম জোরদার করিতে হইবে ।
হামে একটি শিশুর অকালমৃত্যু কিংবা একটি পরিবারের চিরতরে নিঃস্ব হইয়া যাওয়া রাষ্ট্রীয় অবহেলারই শামিল। সংক্রমণ ব্যাধির প্রতিরোধ ও নাগরিকদের জীবন রক্ষায় হামের চিকিৎসা অবিলম্বে সম্পূর্ণ ফ্রি ঘোষণা করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব হইয়া পড়িয়াছে । এই ব্যাপারে আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতেছি ।