রয়টার্সের প্রতিবেদন 

কিমের ‘১২০ ক্ষেপণাস্ত্র’ পুতিনের হাতে, ব্যবহৃত হবে ইউক্রেন যুদ্ধে

উত্তর কোরিয়ার একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিট রাশিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে মোতায়েন শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা। তার মতে, এই ইউনিটে ইউক্রেনে হামলা চালানোর জন্য ১২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ছয়টি লঞ্চার থাকতে পারে। বুধবার (৫ আগস্ট) রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

ইউক্রেন এখন অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার তীব্র ঘাটতিতে ভুগছে। রাশিয়া এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের চেষ্টা করছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা বেশ কঠিন। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে রাশিয়া ইতোমধ্যে ইউক্রেনে উত্তর কোরিয়ার কয়েক ডজন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। উত্তর কোরিয়ার নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী মোতায়েন হলে মস্কো ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

ইউক্রেনের প্রধান গোয়েন্দা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আন্দ্রি চেরনিয়াক জানিয়েছেন, রাশিয়া প্রায় ৯০ জন উত্তর কোরীয় সদস্য নিয়ে গঠিত একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটকে পশ্চিমাঞ্চলীয় ভোরোনেঝ অঞ্চলে মোতায়েন করার পরিকল্পনা করছে। এই ইউনিট রাশিয়ার ১১২তম ক্ষেপণাস্ত্র ব্রিগেডের অধীনে থাকবে।

চেরনিয়াকের মতে, পিয়ংইয়ং ইতোমধ্যে নতুন করে ৪০টি কেএন-২৩ ও কেএন-২৪ ক্ষেপণাস্ত্র এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের রাশিয়ায় পাঠিয়েছে। তবে মোতায়েনের সুনির্দিষ্ট কাঠামো ও মোট ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা আগামী মাসে উচ্চপর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হবে। তিনি বলেন, রাশিয়া আশা করছে এই মোতায়েনে মোট ১২০টি উত্তর কোরীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ছয়টি লঞ্চার থাকবে।

রুশ ক্ষেপণাস্ত্র অভিযানে উত্তর কোরিয়ার সেনারা ঠিক কী ভূমিকা পালন করবে, সে বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কিছু জানা যায়নি।

চেরনিয়াক যে মোতায়েনের কথা বলেছেন, তার সঙ্গে গত সপ্তাহে রাশিয়ার ইউক্রেনে উত্তর কোরিয়ার দুটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সময়কাল মিলে যায়। গত আগস্টের পর এটিই ছিল ইউক্রেনে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের প্রথম ঘটনা।

ফিলাডেলফিয়াভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফরেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক রব লি বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার এই সামরিক সম্পদ ইউক্রেনের জন্য বড় ধরনের হুমকি। তার মতে, “ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি। তাই এ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা বাড়লে ইউক্রেনের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে।” তিনি আরও বলেন, চলতি শীতকালে ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অবস্থা কিয়েভের জন্য বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হবে। কারণ আগের বছরগুলোর মতো রাশিয়া আবারও ব্যাপক হামলা চালিয়ে বিদ্যুৎ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করতে পারে।

চেরনিয়াকের বক্তব্যের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স। তিনি জানিয়েছেন, তার তথ্য এমন গোয়েন্দা সূত্রের ওপর ভিত্তি করে তৈরি, যা সংবেদনশীল হওয়ায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং নিউইয়র্কে জাতিসংঘে উত্তর কোরিয়ার দূতাবাস রয়টার্সের লিখিত মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিক কোনো জবাব দেয়নি।

প্রসঙ্গত, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকে উত্তর কোরিয়া মস্কোর ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালে দুই দেশ একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও স্বাক্ষর করে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি, উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার যুদ্ধ প্রচেষ্টায় লাখ লাখ আর্টিলারি গোলা সরবরাহ করেছে। পাশাপাশি ২০২৪ সালে ইউক্রেনীয় বাহিনীর স্থল অভিযান প্রতিহত করতে উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে ১৪ হাজার সেনা পাঠিয়েছিল।

গত সপ্তাহে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, উত্তর কোরিয়ার একটি ক্ষেপণাস্ত্র মধ্য ইউক্রেনের রাদুশনে গ্রামে একটি আবাসিক বাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। এতে একই পরিবারের অন্তত পাঁচজন নিহত হন। চেরনিয়াকের দাবি, গত সপ্তাহের ওই হামলা ২০২৫ সালের আগস্টের পর উত্তর কোরিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের প্রথম নথিভুক্ত ঘটনা। হামলায় নতুন করে সরবরাহ করা ৪০টি ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাচ থেকে একটি ব্যবহার করা হয়েছিল।

উত্তর কোরিয়ার কেএন-২৩ ও কেএন-২৪ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ও বহনক্ষমতা রাশিয়ার সমমানের ইস্কান্দার ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় বেশি। তবে ইউক্রেনীয় সামরিক সূত্রগুলোর মতে, এগুলো অনেক কম নির্ভুল এবং অতীতে এসব হামলার সঙ্গে বিপুল বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনা জড়িত ছিল।

কেএন-২৩ ও কেএন-২৪ ব্যবহার এমন একটি ধারার সঙ্গে মিলে যায়, যেখানে রাশিয়া আরও বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের চেষ্টা করছে। এর মধ্যে রয়েছে রাশিয়ার ইস্কান্দার ৯এম৭২৩ ক্ষেপণাস্ত্র, যা কেবল যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়েই প্রতিহত করা সম্ভব।

২০২৩ সালের শেষের দিকে ইউক্রেন যুদ্ধে কেএন-২৩ ও কেএন-২৪ ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার শুরু করে রাশিয়া। চেরনিয়াকের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের শেষ ভাগ থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে মোট ১৫০টি ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে। বর্তমানে ইউক্রেন সীমান্তবর্তী রাশিয়ার কুরস্ক অঞ্চলে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা অবস্থান করলেও তারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে না। তবে গত মাসেই ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, ক্রেমলিন উত্তর কোরিয়া থেকে আরও ৩০ হাজার সেনা আনার পরিকল্পনা করছে, যাদের গ্রহণের জন্য রাশিয়ার ভোরোনেঝ অঞ্চলে প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।