অতিরিক্ত বৃষ্টিতে উত্তরাঞ্চলে সবজি-ফসলের ক্ষতি, হঠাৎ সরবরাহ ঘাটতিতে বেড়েছে দাম

প্রধান সবজি উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলোতে গ্রীষ্মকালীন সবজির উৎপাদন ৫০ শতাংশ বা তারও বেশি কমে গেছে, যার ফলে শহরের বাজারগুলোতে সবজির সরবরাহে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটেছে। এতে করে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মতে – খামার পর্যায় থেকে শুরু করে পাইকারি ও খুচরা বাজার পর্যন্ত সর্বত্রই সবজির দাম দ্বিগুণ বা তিনগুণ বেড়ে গেছে।

জুলাইয়ের শুরুর দিকে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে উত্তরাঞ্চলসহ সবজি উৎপাদনকারী এলাকাগুলোতে ঘন ঘন বৃষ্টিপাত ও মাঠে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। বৃষ্টির আগে সবজির দাম কম ছিল।

দেশের উত্তারাঞ্চলে সবজি উৎপাদনকারী দুই জেলা রংপুর ও গাইবন্ধার কৃষক ও ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জুলাই টানা বৃষ্টির আগে ও পরের ব্যবধানে প্রতিমন (৪০ কেজি) পটল ৪০০ টাকা থেকে বেড়ে ১,৬০০ টাকা। মরিচ ৮০০ টাকা থেকে ১০,০০০ টাকা, বেগুন ১,৬০০ টাকা থেকে ৩,০০০ টাকা, ঢেঁড়স ৪০০ টাকা মনের ঢেড়শের বর্তমান দাম ২৪শ টাকা, করলা ১,৫০০ টাকা থেকে ৩,০০০ টাকা এবং বরবটি ৬০০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,৮০০ টাকায়। একই হারে মিস্টি কুমড়া, লাউ, জালি কুমরা, ধুন্দল, ঝিঙা, চিচিংগা এবং কাঁচা কলার দামও বেড়েছে একই হারে।

রংপুর ও গাইবান্ধার কয়েকজন সবজি চাষি ৩১ জুলাই এই প্রতিবেদককে জানান যে, সবজির উৎপাদন ৫০ থেকে ২০ শতাংশে নেমে আসায় হাটে সবজির সরবরাহও একই হারে কমেছে। পাইকারদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। ফলে কৃষকরা বেশি দাম পাচ্ছেন। ঢাকা- চট্টগ্রামসহ বড় বিভিন্ন জেলা শহরে সবজি সরবরাহকারী পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, বাড়তি দাম দিয়েও মোকামের চাহিদা অনুযায়ী সবজি কিনতে পারছি না। কৃষকরা যোগান দিতে পারছেন না। আগে যে কৃষক ৪ মন সবজি নিয়ে হাটে আসতেন তিনি বর্তমানে এক দেড় মনের বেশি দিতে পারছেন না।

জেলা দুটির সবজি চাষিরা ৩১ জুলাই এ প্রতিবেদকে জানান, পাইকারী ক্রেতারা প্রতিযোগিতা করে সবজি কিনছেন, এতে হাটে সবজির বেশি দাম পাওয়া যাচ্ছে। পাইকারী ব্যবসায়ীরা জানান, চাহিদা অনুযায়ী কৃষকরা হাটে সবজির আনতে পারছেন না।

রংপুর মিঠাপুকুরের মশামারি গ্রামের সবজি চাষি মোঃ মতিয়ার রহমান (৪৪) এ বছর ১০০ শতাংশ জমিতে আদা, বরবটি, বেগুন চাষ করেছিলেন। "ঘন ঘন বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট
জলাবদ্ধতায় সবজির পুরো ক্ষেত তলিয়ে গেছে। অধিকাংশ ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। এতে আগে যেখানে ৬ মন বেগুন পেতাম, এখন সেখানে মাত্র দেড় মন বেগুন তুলতে পারছি। উৎপাদন কমলেও সবজির ভালো দাম পচ্ছি।" জানান তিনি।

পীরগঞ্জের রোজবাহাপুরের চাষি রুহুল আমিন (৩২) জানান, ১৫০ শতাংশ জমিতে কাঁচামরিচ, পটল, করলা ও লাউয়ের ক্ষেত করেছিলাম তার মধ্যে ১২০ শতাংশ ক্ষেতের আবাদ নষ্ট হয়ে গেছে। এতে দেড় লাখ টাকা ব্যয় হলেও বৃষ্টির আগে পরে মাত্র ২০ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করতে পেরেছেন। এখন ক্ষেতে সবজি নেই, কিন্তু বাজার চড়া।

অতিবৃষ্টিতে ক্ষেতে পানি জমে গাছ পচে না গেলে স্বাভাবিক বাজারেই অন্তত ৪ লাখ টাকা মূল্যোর সবজি উৎপাদন হোত।

সবজি উৎপাদনকারী আরেক জেলা গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের রাঘবেন্দ্রপুরের চাষি সাইদুর রহমান (৩৮) জানান, বৃষ্টির কারণে সেখানকার অধিকাংশ কৃষকের অর্ধেকেরও বেশি সবজি ফসল নষ্ট হয়েছে। তিনি বলেন, "প্রতি বছরই বৃষ্টি হয়, কিন্তু এ বছরের মতো এমন পরিস্থিতি আগে কখনো দেখিনি। আমার ৯০ শতাংশ জমির ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। আগে প্রতি সপ্তাহে ৪-৫ মণ সবজি বিক্রি করতাম, কিন্তু এখন প্রায় কিছুই বিক্রি করতে পারছি না।" তিনি আরও জানান, গত বছর তাঁর জমিতে ১০০ মণ মরিচ উৎপাদিত হয়েছিল, কিন্তু এ বছর হয়েছে মাত্ৰ ১৫ মণ।

মিঠাপুকুরের জায়গিরহাটের পাইকারি ব্যবসায়ী বালা মিয়া (৬৪) জানান, জুলাইয়ের শুরুর দিকের ভারী বর্ষণের পর থেকে সবজির সরবরাহ অন্তত ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ কমে গেছে। তিনি বলেন, “আগে হাটে মাত্র পাঁচজন কৃষকের কাছেই আমার প্রয়োজনীয় সবজি পাওয়া যেত, কিন্তু এখন পুরো হাটে খুঁজলেও পর্যাপ্ত সবজি মেলে না। বৃষ্টির আগে যে সবজি প্রতি কেজি ১০ টাকায় কিনতাম, এখন তার জন্য ৩০-৪০ টাকা গুনতে হচ্ছে।" তিনি আরও জানান, আগে যেখানে তিনি ঢাকায় বা অন্য কোনো শহরে সবজিভর্তি পাঁচটি ট্রাক (প্রতিটিতে ১৫ টন ধারণক্ষমতা) পাঠাতে পারতেন, এখন সেখানে দুটি ট্রাক পাঠানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। এই সংকট কতদিন চলতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শীতকালীন সবজি বাজারে এলে সরবরাহ স্বাভাবিক হতে পারে।

পীরগঞ্জের বালুয়াবাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী আব্দুল হক (৫৫) জানান, বৃষ্টির কারণে উত্তরাঞ্চলের অধিকাংশ সবজি ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং উৎপাদন ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ কমে গেছে। আগে তিনি প্রতি সপ্তাহে ৩০-৪০ টন সবজি পরিবহন করতেন, কিন্তু বর্তমানে তিনি ব্যবসা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছেন। তিনি বলেন, "কোনো কৃষক যদি হাটে দুই মণ সবজি নিয়ে আসেন, তবে পাঁচজন ব্যবসায়ী তা কেনার জন্য প্রতিযোগিতা করেন এবং দাম বাড়িয়ে দেন। এ কারণেই যে সবজির দাম আগে ১০ টাকা ছিল, এখন তা ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।"

গাইবান্ধার সাদুল্লাপুরের ধাপেরহাটের আরেক পাইকারি ব্যবসায়ী রাশেদুল ইসলাম (৫০) বলেন, "ঢাকা ও চট্টগ্রামের পাইকারি ব্যবসায়ীরা ফোন করে সবজি পাঠাতে বলছেন, কিন্তু আমি তাদের চাহিদা মেটাতে পারছি না। অধিকাংশ কৃষকের ফসল নষ্ট হয়ে গেছে। যখনই কয়েকজন কৃষক তাদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে বাজারে আসেন, ব্যবসায়ীরা তা কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েন, ফলে দাম বেড়ে যায়।" তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, কৃষিপণ্যের দাম চাহিদা ও সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়, কোনো সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নয়।