বাজারে প্রচলিত আটটি ব্র্যান্ডের রং ফরসাকারী ক্রিমে মানুষের শরীরের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক মাত্রার 'মার্কারি' বা পারদের উপস্থিতি পাইয়াছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। এইখানে আমরা তিনটি গুরুতর দিক দেখিতে পাইতেছি। প্রথমত, গায়ের রং ফরসা করিবার ভাবনাটাই বর্ণবাদী। আমাদের সমাজে এখনো 'সুন্দর' বলিতে 'ফরসা' ত্বককে গণ্য করা হয়। যাহাদের গায়ের রং কালো, তাহাদের বলা হয় গায়ের রং 'ময়লা'। দ্বিতীয়ত, ত্বক ফরসাকারী ক্রিমের ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার এক কথায় হঠকারী। তৃতীয়ত, মার্কারি বা পারদের বিপদ কতখানি ভয়াবহ আমরা সেই ব্যাপারে সম্ভবত সচেতন নহি।
প্রকৃত অর্থে, মানুষের ত্বকের রং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা যতদিন সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত থাকিবে, ততদিন বিপজ্জনক ফরসাকারী প্রসাধনীর বাজারও টিকিয়া থাকিবে। আটটি ত্বক ফরসাকারী ক্রিমে অনুমোদিত মাত্রার বহু গুণ অধিক মার্কারি (পারদ) শনাক্ত হওয়াটা আমাদের সমাজের গভীরতর এক মানসিক অসুস্থতারও সংবাদ বটে। আমাদের সমাজে যাহার গায়ের রং শ্যাম বা কৃষ্ণবর্ণ, তাহাকে অবলীলায় বলা হয়-'রং ময়লা'। মানুষের সৌন্দর্যকে তাহার চরিত্র, মেধা, ব্যক্তিত্ব বা মানবিকতার পরিবর্তে কেবল ত্বকের রঙে পরিমাপ করা সভ্যতার পরিচয় নহে। আরো উদ্বেগের বিষয়, এই ধারণা পরিবার, বিজ্ঞাপন, বিনোদনমাধ্যম এবং বিবাহবাজারের মাধ্যমে প্রজন্মের পর প্রজন্মে পুনরুৎপাদিত হইতেছে। ফলে অসংখ্য মানুষ নিজের স্বাভাবিক রংকে লজ্জার বিষয় বলিয়া ভাবিতে শেখে। এই মানসিকতার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন যেমন প্রয়োজন, তেমনি রাষ্ট্রকেও শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যম ও বিজ্ঞাপন নীতির মাধ্যমে বর্ণবাদী সৌন্দর্য-ধারণার বিরোধিতা করিতে হইবে। প্রসাধনীর বিজ্ঞাপনে ত্বকের রং পরিবর্তনকে সাফল্য, আত্মবিশ্বাস বা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার প্রতীক হিসাবে উপস্থাপন করা, নিরুৎসাহিত করাও সময়ের দাবি।
এই বর্ণবাদী মানসিকতার সুযোগ লইয়াই ফরসাকারী ক্রিমের বিশাল বাজার গড়িয়া উঠিয়াছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই সকল পণ্যের বৈজ্ঞানিক কার্যকারিতা সন্দেহজনক; বরং দ্রুত ফল লাভের লোভ দেখাইয়া ভোক্তাকে বিপদের দিকে ঠেলিয়া দেওয়া হয়। সৌন্দর্য কখনো রাসায়নিক শর্টকাটের বিষয় নহে। চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতিরেকে কিংবা পণ্যের বৈধতা যাচাই না করিয়া ত্বকে শক্তিশালী রাসায়নিক প্রয়োগ করা একপ্রকার হঠকারিতা। বিএসটিআই যেহেতু জানাইয়াছে যে, এই সকল পণ্যের অনেকই চোরাই পথে দেশে প্রবেশ করে, সেহেতু বাজার তদারকি, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, অনলাইন বিপণন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ধরনের পণ্যের প্রচারের উপরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হইল মার্কারির উপস্থিতি। পারদ একটি সুপরিচিত বিষাক্ত ভারী ধাতু। মানবদেহে ইহার কোনো উপকারী ভূমিকা নাই; বরং অতি অল্প মাত্রাতেও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে ইহা শরীরে সঞ্চিত হইতে থাকে। ত্বকে লাগানো প্রসাধনীর মাধ্যমে পারদ ধীরে ধীরে রক্তে প্রবেশ করিতে পারে এবং কিডনি, স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলিতে সক্ষম। ত্বক পাতলা হইয়া যাওয়া, স্থায়ী দাগ, অ্যালার্জি, কিডনির কার্যক্ষমতা হ্রাস, স্মৃতিশক্তি ও স্নায়বিক সমস্যার পাশাপাশি গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে ইহা অনাগত শিশুর মস্তিষ্ক ও শারীরিক বিকাশেও গুরুতর ক্ষতি করিতে পারে। পরিবেশেও পারদের ক্ষতিকর প্রভাব সুদূরপ্রসারী; ইহা মাটি ও পানিতে ছড়াইয়া খাদ্যশৃঙ্খলেও প্রবেশ করিতে পারে। ফলে এই বিপদ ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ছাড়াই জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ-উভয়ের জন্যই হুমকি।
প্রকৃত অর্থে, শরীরের রং ফরসা নহে, বিদূরিত করা প্রয়োজন মনের ময়লা। বিএসটিআইয়ের অভিযান প্রশংসনীয়; কিন্তু কেবল অভিযান যথেষ্ট নহে। অনুমোদনহীন প্রসাধনী আমদানি ও বিক্রয়ের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করিতে হইবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয় হইতে গণমাধ্যম পর্যন্ত সর্বত্র এই বার্তা প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন-মানুষের মর্যাদা তাহার ত্বকের রঙে নির্ধারিত হয় না। যেইদিন আমরা 'ফরসা' নহে, 'সুস্থ' ও 'স্বাভাবিক' ত্বককে মূল্য দিতে শিখিব, সেই দিনই বিপজ্জনক ফরসাকারী ক্রিমের বাজারও সংকুচিত হইতে শুরু করিবে। সমাজের চিকিৎসা শুরু হউক মানসিকতার পরিবর্তন দিয়াই-তাহা প্রসাধনীর বাজারকেও সুস্থ করিবে।