প্রতি বছর ৬ আগস্ট মানবসভ্যতা গভীর শোক, অনুশোচনা ও আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে হিরোশিমা দিবস পালন করে। ১৯৪৫ সালের এই দিন জাপানের হিরোশিমা শহরের ওপর মানব ইতিহাসের প্রথম যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করা হয়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি প্রাণবন্ত নগরী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। তিন দিন পর নাগাসাকিতে দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণে বিশ্ব প্রত্যক্ষ করে প্রযুক্তির সবচেয়ে ভয়ংকর ও অমানবিক ব্যবহার।
হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলায় মোট নিহতের সংখ্যা আনুমানিক ২ লাখ ২০ হাজার। এর মধ্যে হিরোশিমায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার এবং নাগাসাকিতে প্রায় হাজার ৮০ হাজার মানুষ মারা যায়। অসংখ্য মানুষ আজীবন বিকলাঙ্গতা, ক্যানসার এবং জেনেটিক জটিলতার শিকার হয় । সেই ক্ষত আজও মানবতার বিবেককে নাড়া দেয়।
হিরোশিমা দিবস কেবল অতীত স্মরণের দিন নয়; এটি ভবিষ্যৎ রক্ষার শপথ গ্রহণের দিন । এমন এক পৃথিবী নির্মাণের অঙ্গীকারের দিন, যেখানে কোনো রাষ্ট্র, কোনো সরকার কিংবা কোনো গোষ্ঠী আর কখনো মানবজাতির বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে না পারে ।
আজ, ২০২৬ সালের বিশ্বে যখন নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্র আধুনিকীকরণ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন হিরোশিমার শিক্ষা আরো বেশি প্রাসঙ্গিক।
১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল ৮টা ১৫ মিনিট । যুক্তরাষ্ট্রের বি-২৯ বোমারু বিমান Enola Gay 'Little Boy' নামের ইউরেনিয়ামভিত্তিক পারমাণবিক বোমাটি হিরোশিমার ওপর নিক্ষেপ করে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সৃষ্টি হয় কয়েক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, প্রচণ্ড বিস্ফোরণ এবং প্রাণঘাতী বিকিরণ। তিন দিন পর ৯ আগস্ট ইউএসএএএফ বি-২৯ Bockscar বিমান থেকে নাগাসাকিতে 'Fat Man' নামের প্লুটোনিয়ামভিত্তিক বোমা ফেলা হয় ।
হিরোশিমা ও নাগাসাকির বেঁচে যাওয়া মানুষদের জাপানে বলা হয় হিবাকুশা (Hibakusha)। তাদের জীবনসংগ্রাম বিশ্বকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় – পারমাণবিক যুদ্ধে কোনো বিজয়ী নেই; সবাই পরাজিত।
অনেকে মনে করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পারমাণবিক অস্ত্রের গুরুত্ব কমে গেছে। বাস্তবতা ঠিক উলটো । বর্তমানে বিশ্বের অন্তত ৯টি রাষ্ট্রের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। এগুলো হলো- যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন, ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া এবং ইসরাইল (যদিও ইসরাইল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে না)।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ১২ হাজারেরও বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড বিদ্যমান। এর মধ্যে হাজার হাজার অস্ত্র তাৎক্ষণিক ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত অবস্থায় রয়েছে। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, বড় শক্তিগুলো নতুন প্রজন্মের
ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিন, হাইপারসনিক বাহন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সমর্থিত সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে ‘স্নায়ুযুদ্ধ', যা মূলত যুক্তরাষ্ট্র এবং তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে এক পারমাণবিক অস্ত্রের ভান্ডার গড়ার প্রতিযোগিতা ছিল। সে সময় 'পারমাণবিক ধ্বংসের পারস্পরিক নিশ্চিত নিশ্চয়তা' (Mutual Assured Destruction - MAD) নামক একটি তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে বিশ্ব শান্ত থাকার অভিনয় করেছিল ।
কিন্তু সময় বদলালেও অস্ত্রের চরিত্র কেবল আধুনিকই হয়নি, বরং আরো বেশি ধ্বংসাত্মক হয়েছে। বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্রগুলো আগের চেয়ে হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী। আজকের হাইপারসনিক মিসাইল, ট্যাকটিক্যাল নিউক্লিয়ার উইপন এবং এআই-নিয়ন্ত্রিত ওয়ারহেডগুলো যুদ্ধকে আরো ত্বরান্বিত করে তুলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অবনতির ফলে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা এক নতুন এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। পরাশক্তিগুলোর মধ্যে ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আজ বিশ্বকে আবার সেই শীতল যুদ্ধের দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার কৌশলগত টানাপড়েন বিশ্বের মোট পারমাণবিক অস্ত্রের প্রায় ৯০ শতাংশই রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার হাতে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মস্কো বারবার তাদের পারমাণবিক সক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে বিশ্বকে সতর্ক করেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও তার পারমাণবিক অস্ত্রাগার আধুনিকায়নে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিগুলো (যেমন : নিউ স্টার্ট চুক্তি) আজ মৃতপ্রায় এবং দুই দেশের মধ্যকার আস্থার সংকট এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে যে কোনো ভুল বোঝাবুঝি সমগ্র পৃথিবীকে ছাইয়ে পরিণত করতে পারে। চীন তার পারমাণবিক অস্ত্রাগার দ্রুত প্রসারিত করছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, বেইজিং ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের পারমাণবিক ওয়ারহেডের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি করতে পারে । এর ফলে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে তাইওয়ান প্রণালি এবং দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে তীব্র সামরিক প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল আজ বিশ্বের অন্যতম সংবেদনশীল পারমাণবিক হটস্পটে পরিণত হয়েছে। উত্তর কোরিয়া আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও বিশ্বমঞ্চের সতর্কবার্তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তার আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং পারমাণবিক কর্মসূচির পরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ইসরাইল এবং পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে যে উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ভারত ও পাকিস্তানের মতো পুরোনো পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার সংকটও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বারবার হুমকির মুখে ফেলছে।
আজকের পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অপব্যবহার এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের সংমিশ্রণে পারমাণবিক অস্ত্র পরিচালনা ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে, যেখানে মানুষের নিয়ন্ত্রণের সুযোগ কমে আসছে। এটি এক নতুন নৈতিক সংকটের জন্ম দিয়েছে—যেখানে মানুষ নয়, বরং অ্যালগরিদম নির্ধারণ করতে পারে মানবজাতির ভবিষ্যৎ ভাগ্য।
আইনস্টাইন আক্ষেপ করে বলেছিলেন, 'আমি জানি না তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে কী অস্ত্র ব্যবহার করা হবে তবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধে মানুষ লাঠি ও পাথর নিয়ে লড়াই করবে।' আজকের পরাশক্তিগুলোর অস্ত্র প্রতিযোগিতা সেই আশঙ্কাকেই সত্য প্রমাণ করার উপক্রম করেছে।
জাতিসংঘের পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ চুক্তি (TPNW) মানবজাতির জন্য একটি আশার আলো হলেও, প্রধান পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো এখনো এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত রয়েছে। তাদের এই উদাসীনতা বিশ্ববিবেকের প্রতি এক গভীর অবজ্ঞা । প্রশ্ন হলো—কত লাখ মানুষের প্রাণহানির বিনিময়ে পরাশক্তিগুলোর অহংকার তৃপ্ত হবে?
অনেক রাষ্ট্র মনে করে, পারমাণবিক অস্ত্র তাদের নিরাপত্তার চূড়ান্ত গ্যারান্টি। কিন্তু বাস্তবে এই ধারণাই অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে আরো তীব্র করে তোলে । এক দেশের অস্ত্র বৃদ্ধি অন্য দেশের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করে, আর সেই ভয় নতুন অস্ত্র তৈরির প্রেরণা হয়ে ওঠে। ফলে নিরাপত্তা নয়, বরং অনিরাপত্তার চক্রই শক্তিশালী হয়।
একটি মাঝারি শক্তির পারমাণবিক বোমা কোনো বড় শহরে বিস্ফোরিত হলে কয়েক লাখ মানুষ মুহূর্তেই নিহত হতে পারেন। হাসপাতাল, বিদ্যুৎ, পানি, যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়বে। উদ্ধারকাজ কার্যত অসম্ভব হয়ে যাবে। প্রথমত তীব্র তাপ ও বিস্ফোরণের অভিঘাতে মুহূর্তের মধ্যে অসংখ্য প্রাণ ঝরে যায়। দ্বিতীয়ত, তেজস্ক্রিয় বিকিরণ মানবদেহের কোষ ধ্বংস করে ক্যানসার, লিউকেমিয়া, হৃদরোগসহ বহু জটিল রোগ সৃষ্টি করে । তৃতীয়ত, পরবর্তী প্রজন্ম জন্মগত শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতার ঝুঁকিতে পড়ে।
চতুর্থত, পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও পানির উৎস দীর্ঘ সময়ের জন্য দূষিত হয়ে পড়ে।
অর্থাৎ, একটি পারমাণবিক বিস্ফোরণ শুধু একটি শহর ধ্বংস করে না; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎকেও বিপন্ন করে ।
বিশ্বের পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলো প্রতি বছর শত শত বিলিয়ন ডলার সামরিক খাতে ব্যয় করছে। অস্ত্রের পেছনে বিনিয়োগ মানব উন্নয়নের বিকল্প হতে পারে না। প্রকৃত নিরাপত্তা আসে মানুষের কল্যাণ, ন্যায়বিচার, শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থেকে ।
হিরোশিমা আমাদের শিখিয়েছে—যুদ্ধের সর্বশেষ পরিণতি ধ্বংস, মৃত্যু এবং মানবতার অপমান। কোনো রাজনৈতিক বিজয়, সামরিক আধিপত্য কিংবা কৌশলগত সুবিধা লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষের জীবনের চেয়ে মূল্যবান হতে পারে না ।
আজ হিরোশিমা দিবসে আমাদের প্রত্যয় হোক—পৃথিবী হবে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত, যুদ্ধমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ। বিজ্ঞান মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হবে, ধ্বংসে নয়; রাষ্ট্রগুলো প্রতিযোগিতা করবে উন্নয়ন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মানবিকতায়, অস্ত্রভান্ডার বৃদ্ধিতে নয়। বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, খাদ্যসংকট ও মহামারির মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, তখন পারমাণবিক অস্ত্রে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ মানবকল্যাণের পরিপন্থি ।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পারমাণবিক বিস্ফোরণের ফলে বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়া ও ধূলিকণা ছড়িয়ে পড়লে সূর্যালোক বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে সৃষ্টি হতে পারে 'পারমাণবিক শীত'। কৃষি উৎপাদন কমে যেতে পারে, দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে কোটি কোটি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। অর্থাৎ, পারমাণবিক যুদ্ধের কোনো বিজয়ী নেই। এতে পরাজিত হয় সমগ্র মানবসভ্যতা।
বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাসী একটি দেশ। 'সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়' নীতি আজও বাংলাদেশের কূটনীতির অন্যতম ভিত্তি। বাংলাদেশ জাতিসংঘের বিভিন্ন শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং নিরস্ত্রীকরণ ও বৈশ্বিক শান্তির পক্ষে ধারাবাহিকভাবে অবস্থান নিয়েছে। একটি পরমাণু অস্ত্রমুক্ত পৃথিবী প্রতিষ্ঠার প্রশ্নেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতিবাচক ভূমিকা রেখে চলেছে।
পারমাণবিক অস্ত্র নিরাপত্তার প্রতীক নয়; এটি মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য হুমকি । অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। হিরোশিমা দিবসে আমরা প্রতিজ্ঞা করতে পারি—আমরা যুদ্ধ নয়, শান্তিকে বেছে নেব ।
লেখক : ফিকামলি তত্ত্বের জনক; বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক