তালেবান শাসনে নারীদের ফুটবল নিষিদ্ধ হওয়ার পর দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন আফগানিস্তানের জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা। চার বছরের বেশি সময় পর ফিফার স্বীকৃতি নিয়ে আবারও একসঙ্গে মাঠে ফিরেছেন তারা। নিউজিল্যান্ডে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেললেও তাদের কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল আফগান নারীদের প্রতিনিধিত্ব করে আবারও জার্সি গায়ে তোলা।
ড্রেসিংরুমে ম্যাচ শুরুর প্রস্তুতি চলছে। কেউ স্ট্রেচিং করছেন, কেউ বুটের ফিতা বাঁধছেন, আবার কেউ সতীর্থকে জড়িয়ে ধরে সাহস জোগাচ্ছেন।
"শক্ত থাকো। আমরা শুধু নিজেদের জন্য নয়, আফগান নারীদের প্রতিনিধিত্ব করছি।" সতীর্থদের উদ্দেশে এমন কথাই বলেন মিডফিল্ডার ফাতিমা হায়দারি।
আফগানিস্তানের পতাকা টাঙানো ড্রেসিংরুমে জাতীয় সংগীত বাজতেই অনেক খেলোয়াড় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। এরপর কোচের শেষ অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য শুনে মাঠে নামেন তারা, যে মাঠে একসময় তাদের খেলার অধিকারই ছিল না।
২৩ সদস্যের এই দলটি গঠিত হয়েছে বর্তমানে বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেওয়া আফগান নারী ফুটবলারদের নিয়ে। তারা নিউজিল্যান্ডে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অংশ নেন এবং কুক আইল্যান্ডসের বিপক্ষে দুটি অনানুষ্ঠানিক প্রীতি ম্যাচ খেলেন।
এটাই প্রথমবার, যখন চলতি বছরের এপ্রিলে ফিফা তাদের ভবিষ্যতে আফগানিস্তানের হয়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অনুমতি দেওয়ার পর পুরো দল একত্রিত হয়েছে।
২০২১ সালের আগস্টে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর আফগানিস্তানে নারীদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা, অধিকাংশ পেশা এবং সংগঠিত খেলাধুলায় অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে ২০০৭ সালে গঠিত আফগানিস্তান নারী ফুটবল দল কার্যত ভেঙে যায়। অনেক খেলোয়াড় অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেন।
দীর্ঘদিনের প্রচারণার পর 'আফগান উইমেন ইউনাইটেড' নামে শরণার্থী দল গঠনের অনুমোদন দেয় ফিফা। এখন এই দলটি ভবিষ্যতে বিশ্বকাপ ও অলিম্পিকের বাছাইপর্বেও অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে।
দলের সদস্য মনোজ নুরি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন। কাবুলে বড় হওয়ার সময় ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলতেন তিনি। পরিবারের বিরোধিতার কারণে পরিচয় গোপন রাখতে মুখ ঢেকে খেলতেন। পরে জাতীয় পর্যায়ে একের পর এক শিরোপা জিতলেও পরিবারের চাপে কিছুদিন ফুটবল ছাড়তে হয়েছিল।
তালেবান ক্ষমতায় ফেরার সময় দেশ ছাড়ার আগে নিজের জেতা পদক ও ট্রফিগুলো বাড়ির বাগানে পুঁতে রেখে যান নুরি। এখনো সেগুলো সেখানেই আছে।
নুরির ভাষায়, "একদিন দেশে ফিরে সেগুলো আবার তুলে আনব।"
দলের আরেক সদস্য মুরসাল সাদাত বলেন, "আমি যদি ফুটবলার না হতাম, তাহলে হয়তো এখনো আফগানিস্তানেই থাকতাম। লাখো মেয়ের মতো পড়াশোনা বা নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেওয়ার সুযোগ পেতাম না।"
ইংল্যান্ডে বসবাসকারী ডিফেন্ডার নাজমা আরেফিও বলেন, আফগানিস্তানে মেয়েদের সবচেয়ে খারাপ সময়ে অনুশীলনের সময় দেওয়া হতো। ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি গরমেও তাদের অনুশীলন করতে হয়েছে। তবু তারা হাল ছাড়েননি।
কুক আইল্যান্ডসের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ১-০ এবং দ্বিতীয় ম্যাচে ৩-০ ব্যবধানে হারলেও ফলাফল নিয়ে হতাশ নন আফগান নারী ফুটবলাররা।
তাদের কাছে এই দুই ম্যাচ শুধু দুটি প্রীতি ম্যাচ নয়; বরং নির্বাসন, বিচ্ছিন্নতা ও দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর আবারও নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার প্রতীক।
ফিফার স্বীকৃতিকে তারা দেখছেন নতুন এক শুরুর সুযোগ হিসেবে। ভবিষ্যতে বিশ্বকাপ ও অলিম্পিকে আফগানিস্তানের জার্সি গায়ে মাঠে নামাই এখন তাদের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।
সূত্র: বিবিসি