মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে তীব্র বাকবিতণ্ডায় জড়ান। ইরানে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরুর প্রস্তুতির সময় যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত সম্পর্কে হোয়াইট হাউসকে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার অভিযোগ তোলেন তিনি। গত বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট।
ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, ক্যাম্প ডেভিডে মন্ত্রিসভার বৈঠকের একপর্যায়ে এই বাদানুবাদ হয়। প্রতিবেদনে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুই ব্যক্তির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ট্রাম্প হেগসেথকে বলেন, দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতির সমস্যাটি ‘সমাধান হয়ে গেছে’ বলেই তিনি মনে করেছিলেন।
আরেক মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন বুধবার জানায়, মার্কিন সামরিক বাহিনী থাড ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টরগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ এবং প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার প্রায় ৫০ শতাংশ ইন্টারসেপ্টর ইতোমধ্যে ব্যবহার করে ফেলেছে। ফলে এসব অস্ত্রের মজুত ‘বিপজ্জনকভাবে কমে গেছে।’
ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সমস্যা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়লে হেগসেথ দায় তার ডেপুটি স্টিফেন ফেইনবার্গের ওপর চাপিয়ে দেন। তবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট পুরো ঘটনাটিই অস্বীকার করেন। ওয়াশিংটন পোস্টকে তিনি বলেন, এটি ‘শতভাগ ভুয়া খবর। আক্ষরিক অর্থেই কখনো ঘটেনি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথের ওপর সর্বোচ্চ আস্থা রয়েছে।’
একইভাবে পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল বলেন, ‘মন্ত্রী হেগসেথ আমাদের গোলাবারুদের অবস্থান সম্পর্কে কাউকে বিভ্রান্ত করেননি এবং তিনি ডেপুটি সেক্রেটারি ফেইনবার্গকে দায়ীও করেননি।’ তিনি আরও বলেন, ‘অস্ত্রের মজুত নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ, ইরান নিয়ে মন্ত্রীর অবস্থান-এসব দাবি সমানভাবে কাল্পনিক।’
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প নিজেও এসব প্রতিবেদন নিয়ে কথা বলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ রয়েছে এবং যারা এর বিপরীত দাবি করছে, তাদের কারাদণ্ড দেওয়ার হুমকিও দেন। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার বিষয়ে গণমাধ্যমের প্রতিবেদন নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘বিপুল পরিমাণে গোলাবারুদ রয়েছে, বিশেষ করে কিছু নির্দিষ্ট ধরনের গোলাবারুদ।’ তবে তিনি এর বিস্তারিত জানাননি।
ট্রাম্প ও হেগসেথের কথাকাটাকাটির বিষয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন প্রকাশের সময়ই এনবিসি নিউজও জানায়, গত সপ্তাহে ট্রাম্প তার কয়েকজন সহযোগীর ওপর ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। তবে এনবিসির প্রতিবেদনটি একই ক্যাম্প ডেভিডের মন্ত্রিসভা বৈঠকের ঘটনা নিয়ে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের অগ্রগতি নিয়ে ট্রাম্প এবং তাঁর শীর্ষ সহযোগীরা প্রকাশ্যে সন্তুষ্টির ভাব দেখালেও বাস্তবে কেউই বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্ট নন বলে এনবিসি নিউজকে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সামনে কীভাবে এগোনো হবে, তা নিয়েও ট্রাম্পের সহযোগীদের মধ্যে কোনো ঐকমত্য নেই। তাঁর ভাষায়, ‘এত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও কোনো ঐক্য নেই।’
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলা এক ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ মিত্র এনবিসি নিউজকে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত হতাশ।’ ওই মিত্র আরও বলেন, ‘ইরানিদের একটি চুক্তিতে রাজি করানো এত কঠিন হবে বলে তিনি মনে করেননি। কতদিন ধরে কী করা উচিত, কিংবা শেষ লক্ষ্যে কীভাবে পৌঁছানো হবে, সে বিষয়ে আসলে কোনো বাস্তব কৌশল ছিল না।’ তিনি আরও বলেন, ‘তিনি এটিকে দীর্ঘস্থায়ী, টেনে নেওয়া যুদ্ধ হিসেবে চাননি।’
তবে লেভিট ট্রাম্পের মেজাজ হারানো দাবি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘এটি মিথ্যা। প্রেসিডেন্টের একটি দুর্দান্ত দল রয়েছে, যাদের তিনি বিশ্বাস করেন। আর দলের প্রত্যেকেই জানেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী তিনিই।’
যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে স্পষ্টতার অভাব—ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকানো, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত রাখা, নাকি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন কর্মসূচি ধ্বংস করা—যুদ্ধের শেষপর্যায়ের পরিকল্পনা তৈরি করা কঠিন করে তুলেছে বলে ওই মার্কিন কর্মকর্তা এনবিসি নিউজকে জানিয়েছেন।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা ছাড়াই মার্কিন সামরিক বাহিনী নতুন করে বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা একের পর এক কৌশলগত সাফল্য অর্জন করেছি। কিন্তু স্পষ্ট নীতিগত নির্দেশনা বা এই যুদ্ধ কোথায় গিয়ে শেষ হবে সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না থাকায় আমরা একটি কৌশলগত পরাজয়ের মুখোমুখি হচ্ছি।’
তবে এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক বিবৃতিতে পেন্টাগনের মুখপাত্র পারনেল বলেন, প্রতিরক্ষা দপ্তর ‘সম্পূর্ণ প্রস্তুত, সর্বাত্মকভাবে প্রস্তুত এবং যেকোনো মুহূর্তে প্রেসিডেন্টের নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত।’ তিনি আরও বলেন, ‘মন্ত্রী হেগসেথ, সেন্টকমের কমান্ডার অ্যাডমিরাল কুপার এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান কেইন—ইরান-সংশ্লিষ্ট বিদেশি সামরিক অভিযান নিয়ে সম্পূর্ণভাবে একমত এবং মিশন, কৌশল ও সংকল্পের দিক থেকে তারা ঐক্যবদ্ধ।’
ট্রাম্প বারবার ইরানের ওপর বড় ধরনের হামলার হুমকি দিয়েছেন। কিন্তু এরপর আবারও হামলা থেকে সরে এসেছেন এবং আলোচনায় অগ্রগতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। সোমবার তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এমন আলোচনা চলছে, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি আবার খুলে দেওয়া হতে পারে।
আলোচনা সম্পর্কে বুধবার একটি ফক্স অ্যাফিলিয়েট টেলিভিশন চ্যানেলের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি শুনছি, তারা খুব ভালোভাবেই এগোচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘ইরান আমাকে ফোন করেছিল। তারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় হামলাটি চায়নি। আর আমরা বলেছিলাম, “ঠিক আছে, আমি বরং এভাবেই করতে চাই। আমি মানুষ হত্যা করতে এবং সবকিছু পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে চাই না। ” আমরা সেদিকেই এগোচ্ছিলাম। তারা আলোচনা করতে চেয়েছে এবং আমরা তা করছি। মনে হচ্ছে, বেশ ভালোভাবেই এগোচ্ছে।’
আগের আলোচনা, এমনকি যেসব আলোচনা শেষ পর্যন্ত একটি চুক্তিতে পৌঁছেছিল, সেগুলোও যখন সংঘাতের সমাধান করতে পারেনি, তখন এবারের আলোচনা কেন ভিন্ন হবে বলে তিনি মনে করেন—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘হতেও পারে, নাও হতে পারে।’
যে হামলা তিনি শেষ মুহূর্তে বাতিল করেছিলেন, সেটির প্রসঙ্গে ফিরে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, যুদ্ধ আবার শুরু করার হুমকিটি ‘শুধু হুমকি ছিল না। আমরা প্রস্তুত ছিলাম। আর জীবনে মানুষ বুঝতে পারে, আপনি সত্যিই প্রস্তুত কি না, নাকি শুধু ধাপ্পা দিচ্ছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘না, আমরা প্রস্তুত ছিলাম এবং যদি প্রয়োজন হয়, আমরা এখনো প্রস্তুত।’ তবে ইরান বুধবার জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। কিন্তু হরমুজ প্রণালি নিয়ে ওমানের সঙ্গে একটি চুক্তি চূড়ান্ত করার কাজ চলছে, যা যুদ্ধবিরতি পুনর্বহালের পথ তৈরি করতে পারে।
আলোচনা-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রস্তাবিত চুক্তিটি হরমুজ প্রণালি নিয়ে চলমান বিরোধের একটি অস্থায়ী সমাধান হিসেবে কাজ করতে পারে। একই সঙ্গে এটি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনার পথও খুলে দেবে। উল্লেখ্য, যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে কারণগুলো সামনে এনেছিল, তার মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি অন্যতম প্রধান ছিল।
প্রায় এক মাস আগে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের সর্বশেষ পর্বে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশাধিকার অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে। ইরান এই কৌশলগত জলপথে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট ছিল হরমুজ প্রণালি।