সংযুক্তির মাধ্যমে চিকিৎসকরা কেন ঢাকাতেই থাকিতে চাহেন?

প্রয়োজন না থাকিলেও সংযুক্তির মাধ্যমে বহু চিকিৎসক ঢাকার সরকারি মেডিক্যাল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে আসিতেছেন। অন্যদিকে জেলা, উপজেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের বহু হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ শূন্য রহিয়াছে। দেশের এক প্রান্তে চিকিৎসকের আধিক্য, অন্য প্রান্তে চিকিৎসকের অনুপস্থিতি। এই বৈপরীত্য কোনো সুস্থ স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিচয় বহন করে না। একটি রাষ্ট্রের রাজধানী যদি সমস্ত সুযোগ-সুবিধার প্রধান কেন্দ্র হইয়া উঠে, তাহা হইলে বিকেন্দ্রীকরণ কী করিয়া হইবে? সম্প্রতি ইত্তেফাকে প্রকাশিত সংবাদটি সেই বহু দিনের বাস্তবতাকেই আবার সামনে আনিয়াছে।

সংযুক্তি প্রশাসনিক প্রয়োজনের জন্য। কোনো হাসপাতালে হঠাৎ বিশেষজ্ঞের ঘাটতি দেখা দিলে সাময়িকভাবে সেই প্রয়োজন পূরণের একটি ব্যবস্থা; কিন্তু যখন সংযুক্তি যদি প্রয়োজনের ভাষা ভুলিয়া তদবিরের ভাষা শিখে, তাহা হইলে ইহা আর তখন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থাকে না। ইহা পরিণত হয় বিশেষ সুবিধা লাভের উপায়ে। সংবাদে সংযুক্তিকে কেন্দ্র করিয়া সিন্ডিকেটের অভিযোগ উঠিয়াছে। অভিযোগ সত্য হইলে ইহা কেবল নিয়মভঙ্গ নহে, ইহা রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যসেবাকে ব্যক্তিস্বার্থের নিকট সমর্পণ করার নাম। কারণ, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ ঢাকায় বাস করেন না। তাহারা বসবাস করেন জেলা, উপজেলা ও গ্রামে। অসুস্থতা তো রাজধানী চিনিয়া আসে না। হৃদ্রোগ, প্রসবজনিত জটিলতা, দুর্ঘটনা কিংবা ক্যানসারের উপসর্গ দেশের সর্বত্রই দেখা দেয়; কিন্তু চিকিৎসক যদি রাজধানীতেই অবস্থান করিতে চাহেন, তাহা হইলে রোগীকেও রাজধানীর দিকে ছুটিতে হয়। এই কারণেই আজ সরকারি হাসপাতালের শয্যা পূর্ণ। বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি হইতে সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা করিতে হয়। অনেক রোগী শেষ পর্যন্ত বাধ্য হইয়া ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা লইতে যান। একটি রোগ তখন কেবল শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ইহা সংসারের সঞ্চয় গ্রাস করে, ঋণের বোঝা বাড়ায়, বহু পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলিয়া দেয়।

সমস্যার দায় শুধু চিকিৎসকদের উপর চাপাইয়া দিলেও সত্যের পূর্ণচিত্র দেখা যায় না। রাজধানীতে উন্নত প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ, সন্তানের শিক্ষা, পেশাগত যোগাযোগ এবং তুলনামূলক উন্নত জীবনযাত্রা রহিয়াছে। যাহারা ঢাকার বাহিরে কর্মরত থাকেন, তাহাদের অনেকেই সীমিত যন্ত্রপাতি, জনবলসংকট এবং অনিশ্চিত কর্মপরিবেশের মধ্যে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে রাজধানীর প্রতি আকর্ষণ জন্মায় সকলেরই। মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে আদেশ দিয়া দমন করা যায় না; কিন্তু রাষ্ট্রকেই এমন পরিবেশ গড়িয়া তুলিতে হয়, যেইখানে প্রান্তিক কর্মস্থলও সম্মান ও সম্ভাবনার স্থান হইয়া উঠিতে পারে। এইখানেই আমাদের বড় ধরনের গলদ রহিয়া গিয়াছে। এই সমস্যাটি বহুকালের। পরিতাপের বিষয় হইল, সকলেই ইহা জানেন; কিন্তু কেহই ইহার দিকে নজর দেন না।

এখন যাহারা প্রভাব খাটাইয়া সংযুক্তি ব্যবস্থার অপব্যবহার করেন এবং যাহারা তাহাতে সহায়তা করেন, তাহাদের বিরুদ্ধে কি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়? অতীতেও কি হইয়াছে? ইহার উত্তর আর কবে ইতিবাচক হইবে? ইহার সহিত জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলিতে আবাসন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং পদোন্নতির স্বচ্ছ ব্যবস্থা কবে নিশ্চিত হইবে? তাহা না হইলে বদলির কাগজ তৈরি হইবে ঠিকই; কিন্তু ঢাকামুখী স্রোত থামিবে না। আরো একটি সংস্কার বহু দিন ধরিয়া আলোচিত। কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা। সকল রোগীর চিকিৎসা রাজধানীতে হইবার কথা নহে। প্রাথমিক পর্যায়ে যাহা সম্ভব, তাহা সেইখানেই সম্পন্ন হওয়া উচিত। জটিল রোগ ধাপে ধাপে উচ্চতর প্রতিষ্ঠানে যাইবে। পৃথিবীর অধিকাংশ উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা এই নীতিতেই পরিচালিত হয়। বাংলাদেশেও এই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত না হইলে রাজধানীর হাসপাতালগুলির উপর চাপ ক্রমেই বাড়িবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সংযুক্তিতে থাকা চিকিৎসকদের তালিকা প্রস্তুত করিয়া অপ্রয়োজনীয় সংযুক্তি বাতিলের উদ্যোগের কথা জানিয়াছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হওয়া একান্ত প্রয়োজন। গ্রামের অসুস্থ মানুষ চিকিৎসার আশায় শত শত কিলোমিটার পথ অতিক্রম করিবার পূর্বেই নিজের জেলার হাসপাতালেই ভরসা খুঁজিয়া পাইবেন। রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কবে এমন হইবে?