ফুটবল দুনিয়ায় একটা কথা খুব জোরেশোরে প্রচলিত ছিল-ফিফার মতো শক্তিশালী সংগঠন আর কেউ নেই দুনিয়াতে। জাতিসংঘকেও বলা হতো ফিফার নিচে থাকা শক্তিশালী এক সংগঠন। ফিফা কখনো কারো কথা শোনে না। সবাই ফিফার কথা শুনতে বাধ্য। ফিফার আইন মানতে বাধ্য হয়। কোনো রাষ্ট্রীয় শক্তি ফিফার সামনে দাঁড়িয়ে ছড়ি ঘোরাতে পারবে না। ফিফা একমাত্র সংগঠন যারা কোনো একটি ঘটনায় ব্রাজিলকে সাসপেন্ড করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল।
ফিফার ২১১ সদস্য। সদস্যদেশগুলোকে ফিফার নিয়ম নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। রাষ্ট্র কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে পারবে না। কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। সদস্য দেশগুলো চলবে ফিফার নিয়ম মেনে। রাষ্ট্রযন্ত্র হস্তক্ষেপ করলেই সাসপেন্ড করে দেওয়া হবে। ভারতকে সাসপেন্ড করেছিল। বাংলাদেশকে সাসপেন্ড করেছিল, পাকিস্তানকে করেছিল। এখন নেপাল সাসপেনশনের মধ্যে রয়েছে। তৃতীয় পক্ষ হোক আর যে কারণেই হোক-পৃথিবীর অনেক দেশ এখনোও সাসপেনশনের মধ্যে রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল বাংলাদেশে খেলতে আসবে না, নিরাপত্তা অজুহাত দেখিয়েছিল। ফুটবলেও অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচ খেলতে আসতে চাচ্ছিল না, নিরাপত্তা নেই অজুহাত দেখিয়ে। কিন্তু ফিফা বাধ্য করেছিল অস্ট্রেলিয়াকে বাংলাদেশে আসতে। নিরাপত্তা নেই পাকিস্তানে-এ কথা বলে বাংলাদেশ খেলতে যেতে চায়নি। ফিফা বাধ্য করেছিল পাকিস্তানে খেলতে যেতে হবে, বাংলাদেশের ফুটবলারদের হোটেল রুমের প্রতিটি দরজায় সেনাবাহিনীর দুই জন করে সদস্য বসিয়েছিল। এরকম অনেক উদাহরণ রয়েছে ফুটবলে। ফিফা কারো কথা শোনে না। তাদের নিজের সিদ্ধান্তই ফাইনাল। মাথা উঁচু করে থাকা সেই ফিফা এবার বিশ্বকাপ ফুটবলে গৌরব হারিয়েছে।
মাথা উঁচু করে থাকা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠনটি এখন ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর কখনো এমন ভুল হবে না, সেকথাও স্বীকার করে নেয়। ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর একটা ভুলে ফিফাকে ক্ষমা প্রার্থনার কথা লিখে প্রেসরিলিজ দিতে হচ্ছে। ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রকল্প ঘোষণা করে আগামীতে বিশ্বকাপ ফুটবলসহ ফিফার বড় বড় খেলাগুলো বেসরকারি বিনিয়োগকারি হাতে তুলে দিতে ঘোষণা দেয় ফিফা। বেসরকারি বিনিয়োগ করার কথা ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়ের জামাইয়ের ভাইয়ের। ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজের ঘোষণার পরই ফুটবল দুনিয়ায় আগুন লেগে যায়। এত দ্রুতই আগুন ছেিয় পড়ে যে, সব মহাদেশ ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।
পরিস্থিতি এমনই এক জায়গায় যায়, সভাপতিপদ নিয়ে টান দেওয়া ইউরোপিয়ন ফুটবল সংস্থা উয়েফা। একে একে সবাই উয়েফার পক্ষ গ্রহণ করে। ইনফান্তিনো বুঝতে পারেননি তার চিন্তা-ভাবনা তার নিজের চেয়ার নিয়ে টান দেবে। ফিফা একটা উদ্যোগ গ্রহণ করবে অথচ ৫ সহসভাপতিও জানতেন না। বিষয়টা নিয়ে সবাই চরম অপমান বোধ করেছেন। ফিফার ফুটবল উন্নয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত আর্সেন ওয়েঙ্গারও নাকি কিছুই জানতেন না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে এসে ঠেকেছে যে, ইনফান্তিনো দ্রুত সভা ডেকে ক্ষমা প্রার্থনা করা, কোথায় কোথায় ভুল হয়েছে, আর কখনো এসব ভুল হবে না, সবার সঙ্গে কোন বিষয়গুলো আলোচনা হবে-নানান কথা উপলক্ষব্ধি করে লম্বা একখানা চিঠি সংবাদমাধ্যমের কাছে পাঠিয়েছে।
ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ নামের পরিকল্পনাটি ফিফার সদস্যদেরকে বাদ দিয়ে বাস্তবায়ন করার কোনো ইচ্ছা ছিল না। সবার সঙ্গে আলোচনা করার আগেই নাকি সংবাদমাধ্যমের কাছে বিষয়টি চলে গিয়েছিল। ফিফা জানিয়েছে, ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ পরিকল্পনাটি ফিফার সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করেই বাস্তবায়ন করার কথা ছিল। ইনফান্তিনো তার পরিকল্পনাটি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। বেসরকারি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের হাতে বিশ্বকাপ তুলে দিয়ে আর্থিক লাভবান হওয়ার মতো কোনো কিছু নিয়ে আর এগুবে না ফিফা। ইনফান্তিনো এখন যেটাই বলুন, ফুটবল দুনিয়া তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। বিশ্বকাপ চলাকালীন অনেক ঘটনা দেখেছে দুনিয়া। ইরানের সঙ্গে যা হয়েছে তাতে চুপ ছিলেন ইনফান্তিনো। রেফারিকে ঢুকতে না দেওয়া, সংগঠক, সাংবাদিককে বিশ্বকাপে ঢুকতে না দেওয়া, যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলার বালোগানের লালকার্ড প্রত্যাহার করে নেওয়া, সংবাদ সম্মেলনে ইনফান্তিনোর মন্তব্য 'আমরা তো রাজা নই' এরকম অনেক কিছুই আন্তর্জাতিক ফুটবল কর্মকর্তারা নীরবে দেখেছেন, যা কিনা ফিফার ইমেজের সঙ্গে যায় না। ইনফান্তিনোর এখন চেয়ার বাঁচানো কঠিন। চেষ্টা করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডেনাল্ড ট্রাম্পের সাহায্য নিতে। সেখানেও তিনি অন্ধকার দেখছেন।