চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় গত দেড় মাসে ১৫টি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় উপজেলার বিদ্যুৎ গ্রাহকরা এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। এমনকি একই দিনে চারটি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনাও রয়েছে এ এলাকায়। সর্বশেষ চুরি হওয়া ট্রান্সফরমারের মূল্য পরিশোধ করতে দেরি হওয়ায় এলাকাটির অন্তত অর্ধশতাধিক গ্রাহক টানা ১৫০ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
তাছাড়া ট্রান্সফরমার চুরির বিষয়ে থানায় অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া মিলছে না বলে জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা।
চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ মতলব উত্তর উপজেলা জোনাল অফিস সূত্রে জানা যায়, গত ৩১ জুলাই দিবাগত রাতে উপজেলার ফতেপুর পশ্চিম ইউনিয়নের নাউরি ও ফৈলাকান্দি পাশাপাশি এই দুই অঞ্চলে একরাতেই ৪টি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটে। স্থানীয় গ্রাহকরা সকাল বেলা খুঁটির নিচে ট্রান্সফরমার চুরির আলামত দেখতে পায়। পরে বিষয়টি স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগের উপজেলা অফিসকে জানালে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ এই ট্রান্সফরমারের নির্ধারিত মূল্যের অর্ধেক টাকা অফিসে জমা না দেওয়া পর্যন্ত তাদের বিদ্যুৎ সংযোগ না দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এই ৪টি ট্রান্সফরমারের মধ্যে দুটির টাকা জমা দিয়ে অর্ধশত পরিবার ৯৬ ঘণ্টা পর বিদ্যুৎ সংযোগ পেলেও বাকি অর্ধশত পরিবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নের ১৫০ ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও কেবলমাত্র ট্রান্সফরমারের টাকা পরিশোধ করতে না পারায় তারা এখনো রয়েছে অন্ধকারে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আবাসিক গ্রাহকদের এই অর্ধশত পরিবারের অধিকাংশ গ্রাহকই দরিদ্র। একটানা এই ১৫০ ঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় নানান কষ্টের কথা বর্ণনা করেন ভোগান্তির শিকার হওয়া স্থানীয় গ্রাহক আরব আলী, মোবারক উল্লাহ, আকলিমা বেগম ও আরাফা খাতুন।
তাছাড়া এর আগে দুর্গাপুর ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রাম, সুলতানাবাদ ইউনিয়নের দাসের বাজার এলাকাসহ আরও কয়েকটি অঞ্চল থেকেও ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনা ঘটেছে। ট্রান্সফরমারের মূল্যের অর্ধেক টাকা জমা দিতে দেরি হওয়ার তাদেরও দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় থাকতে হয়েছিল।
গ্রাহকরা জানান, ট্রান্সফর্মার চুরির প্রথমবারে অর্ধেক টাকা এবং একই ট্রান্সফরমার একাধিকবার চুরির ঘটনা ঘটলে ট্রান্সফরমারের পুরো মূল্যই গ্রাহককে বহন করতে হচ্ছে।
উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, ট্রান্সফরমার চুরির পর সেটির মূল্য গ্রাহকরা বহন করবে এটি ঠিক নয়। অভিযোগ করেও এসব ঘটনার কোনো সুরাহা মিলছে না।
এদিকে স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসে খোঁজ নিয়ে গেছে, গত দেড় মাসে উপজেলায় ১৫টি ট্রান্সমিটার চুরি হয়। যার অধিকাংশ ট্রান্সফরমারের ধারণক্ষমতা ১০ থেকে ২৫ কেভিএ। আর এই ১০ কেভিএর ৮৩ হাজার টাকা, ১৫ কেভিএর প্রায় ১ লাখ টাকা এবং ২৫ কেভিএর প্রায় ১ লাখ ৫৯ হাজার টাকা।
পল্লী বিদ্যুৎ অফিস ও গ্রাহক সূত্রে জানা যায়, গত দেড় মাসে ১৫টি ট্রান্সফরমার চুরির ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ করেও কোন ঘটনায় জড়িতদের আটক কিংবা কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। বিদ্যুৎ গ্রাহকরা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আসামি আটক কিংবা শনাক্ত করে ট্রান্সফরমার চুরি ঠেকাতে কোনো সহায়তা করতে না পারায় স্থানীয় গ্রাহকরা চরমভাবে ক্ষুব্ধ।
বিদ্যুৎ বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ট্রান্সফরমারের ভেতরে থাকা মূল্যবান তামার কয়েল ও ক্যাবল চোরচক্রের মূল লক্ষ্য। তারা তামার তারগুলো খুলে নিয়ে যায়।
চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর মতলব উত্তর জোনাল অফিসে সহকারী জেনারেল ম্যানেজার (চলতি দায়িত্ব) মো. নাঈম বলেন, যারা ট্রান্সফরমার চুরি করছে তারা তো বিদ্যুৎ সংক্রান্ত কাজে অবশ্যই অভিজ্ঞ। আর অভিজ্ঞ বলেই তো লাইনে বিদ্যুৎ থাকা অবস্থায় ট্রান্সফরমার চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে।
চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর মতলব উত্তর জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) এমডি ওয়াহিদুজ্জামান জানান, ট্রান্সফরমার চুরির সঙ্গে জড়িতদের আটক কিংবা শনাক্ত করা সম্ভব না হলেও আমরা গ্রাহকদের সচেতন করার চেষ্টা করছি। ট্রান্সফরমার চুরি ঠেকাতে গ্রাহকদের সচেতনতা বৃদ্ধিতে আমরা মাইকিং এর মাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছি।
মতলব উত্তর থানার ওসি কামরুল হাসান বলেন, বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার চুরির সঙ্গে জড়িতে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছি। তবে এখনও পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত কিংবা গ্রেপ্তার সম্ভব হয়নি।