আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূতের ম্যাক্স গ্রুপের শিল্পকারখানা পরিদর্শন

বাংলাদেশে নিযুক্ত আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত সাইদানি আজ ম্যাক্স গ্রুপের বিভিন্ন শিল্পকারখানা পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তিনি বাংলাদেশ ও আলজেরিয়ার মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প সহযোগিতা এবং রপ্তানি সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে ম্যাক্স গ্রুপের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

দুপুর ১২টায় রাষ্ট্রদূত ম্যাক্স গ্রুপের আফা স্প্রিং কারখানা পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে তার কর্মসূচি শুরু করেন। কারখানাটিতে বিভিন্ন ধরনের যানবাহনের জন্য স্প্রিং উৎপাদন করা হয়। পরিদর্শনকালে তিনি কারখানার উৎপাদন প্রক্রিয়া, ব্যবহৃত প্রযুক্তি এবং পণ্যের মান সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত হন।

এরপর রাষ্ট্রদূত ম্যাক্স গ্রুপের এসএস পাইপ, ক্রোকারিজ এবং নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। তিনি বিশেষভাবে পরিবেশবান্ধব ব্লক উৎপাদন কার্যক্রম ঘুরে দেখেন এবং এসব শিল্পপণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ সম্পর্কে ধারণা নেন।

পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে রাষ্ট্রদূত সাইদানি বলেন, ম্যাক্স গ্রুপের শিল্পকারখানা ও উৎপাদন সক্ষমতা দেখে তিনি মুগ্ধ হয়েছেন। বাংলাদেশ ও আলজেরিয়ার মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে তিনি বিপুল সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন।

তিনি বলেন, আলজেরিয়া ইস্পাত, প্রাকৃতিক গ্যাস, জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালে সমৃদ্ধ। এসব কাঁচামাল তুলনামূলক প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে ও মানসম্মতভাবে বাংলাদেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো আমদানি করতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চমানের পণ্য আলজেরিয়ার বাজারে রপ্তানি ও বিপণনের সুযোগ রয়েছে।

রাষ্ট্রদূত ম্যাক্স গ্রুপের চেয়ারম্যানকে দ্রুততম সময়ে আলজেরিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানান। তিনি আলজেরিয়ায় ম্যাক্স গ্রুপের নিজস্ব কোম্পানি ও কারখানা স্থাপনেরও প্রস্তাব দেন। এ ক্ষেত্রে আলজেরিয়া সরকার ও দেশটির দূতাবাসের পক্ষ থেকে জমি, বিদ্যুৎ, পানি, কাঁচামালসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা প্রদানের পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব করব্যবস্থার সুযোগ দেওয়ার কথা জানান তিনি।

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের সম্ভাবনা সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত জানান, বাংলাদেশ ও আলজেরিয়ার মধ্যে ইতোমধ্যে ২২টি খসড়া চুক্তি প্রণয়ন করা হয়েছে। এর অধিকাংশই চূড়ান্ত স্বাক্ষরের পর্যায়ে রয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের ব্যবসায়ীদের নিয়ে গঠিত আলজেরিয়া-বাংলাদেশ বিজনেস ফোরাম দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আলজেরিয়া ও বাংলাদেশকে ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ হিসেবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে পারস্পরিক সফর ও যোগাযোগ আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের আলজেরিয়ায় বিনিয়োগের জন্য আমন্ত্রণ জানান।

ম্যাক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী গোলাম মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, প্রায় ৪০ বছর আগে দেশীয় শিল্পে তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল আমদানি বিকল্প পণ্য তৈরি করে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা। এখন সেই পর্যায় পেরিয়ে দেশীয় শিল্পকে রপ্তানিমুখী করার সময় এসেছে। ম্যাক্স গ্রুপ ইতোমধ্যে তাদের স্টেইনলেস স্টিল পণ্য মালয়েশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছে এবং জার্মানিতেও কিছু পণ্য বিক্রি হয়েছে।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন নীতিগত স্থিতিশীলতার অভাবে রপ্তানি খাত কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি। তবে বর্তমান সরকারের রপ্তানি প্রণোদনা ও অন্যান্য উদ্যোগে ব্যবসায়ীরা নতুন করে রপ্তানিতে আগ্রহী হচ্ছেন। আলজেরিয়ার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যেরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে। দেশটি থেকে বেস অয়েল আমদানি করে দেশে লুব্রিকেন্ট উৎপাদন এবং বাংলাদেশের স্টিল, প্রকৌশল, নির্মাণ ও অন্যান্য পণ্য আলজেরিয়ায় রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, ম্যাক্স গ্রুপের স্টেইনলেস স্টিলের কাটলারি, কুকওয়্যার ও কিচেনওয়্যারসহ বিভিন্ন পণ্য আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে তৈরি হচ্ছে। রপ্তানি বাড়াতে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল নীতি গ্রহণের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে হবে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন—দুই ক্ষেত্রেই সুফল মিলবে।

ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে তাত্ত্বিকভাবে দক্ষ গ্র্যাজুয়েট বের হলেও শিল্প খাতে বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে। চিকিৎসকদের মতো প্রকৌশলীদেরও সনদ পাওয়ার আগে নির্দিষ্ট সময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা উচিত। তিনি জানান, ম্যাক্স গ্রুপ প্রতি বছর ৫০ জন প্রকৌশলীকে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা-সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।

ম্যাক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান জানান, একসময় গ্রুপটিতে প্রায় ১৭,০০০ মানুষ কাজ করতেন, যার মধ্যে প্রায় ৪,৪০০ ছিলেন গ্র্যাজুয়েট ইঞ্জিনিয়ার। বর্তমানে কর্মী সংখ্যা কমে ৭,০০০–৮,০০০ হলেও ব্যবসা ও সরকারি প্রকল্পের কার্যক্রম বাড়ায় কর্মসংস্থান আবার বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি আরও বলেন, সেমিকন্ডাক্টর ও সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। ম্যাক্স গ্রুপও সৌরবিদ্যুৎ, বিশেষ করে রুফটপ সোলার ও সোলার পাওয়ার প্ল্যান্টের ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে।
তার মতে, দেশের ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে ব্যবসা সহজ করতে হবে। দেশীয় উদ্যোক্তারা পুনরায় বিনিয়োগ করলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও বাংলাদেশে আসতে উৎসাহিত হবে। একই সঙ্গে ঢাকা শহরের যানজট নিরসন ও অবকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

তিনি বলেন, আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরে দেশে বড় শিল্পগোষ্ঠীর সংখ্যা কয়েকগুণ বাড়াতে হবে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ, রপ্তানি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমেই বাংলাদেশকে আরও উচ্চতায় নেওয়া সম্ভব।