দূষণের উৎসগুলি জানা গেলে, সমাধান মিলিবে?

রাজধানীর চারি পাশের নদীগুলির দূষণ লইয়া বহু গবেষণা, বহু প্রতিবেদন এবং বহু আলোচনা হইয়াছে; কিন্তু বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) সাম্প্রতিক জরিপ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করিয়া দিয়াছে। নদীদূষণের আলোচনা আর অনুমান বা অভিযোগের পর্যায়ে নাই-দূষণের উৎসও চিহ্নিত। রাজধানীসংলগ্ন নদীগুলিতে ৪২৪টি প্রত্যক্ষ বর্জ্য উৎসমুখ শনাক্ত হইয়াছে। ইহার মধ্যে একক সরকারি সংস্থা হিসাবে সর্বাধিক ৬৬টি উৎসমুখ ঢাকা ওয়াসার। অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল শিল্পকারখানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নহে, নগর পরিচালনার মৌলিক কাঠামোর সহিতও ইহা প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত।

এই তথ্যের তাৎপর্য গভীর। দীর্ঘদিন ধরিয়া নদীদূষণের আলোচনায় শিল্পবর্জ্যই প্রধান বিষয় হিসাবে স্থান পাইয়াছে; কিন্তু বর্তমান জরিপ দেখাইতেছে, অপরিকল্পিত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাও সমানভাবে দায়ী। রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় বৃষ্টির পানি ও পয়োবর্জ্যের পৃথক নিষ্কাশন ব্যবস্থা নাই। ফলে গৃহস্থালি বর্জ্য, মানববর্জ্য এবং বর্ষার পানি একই ড্রেনেজ ব্যবস্থায় প্রবাহিত হইয়া শেষ পর্যন্ত নদীতেই গিয়া পড়ে। ইহা কেবল প্রকৌশলগত সীমাবদ্ধতা নহে-নগর পরিকল্পনার দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতার প্রতিফলন। বিশেষজ্ঞরা বহু দিন ধরিয়াই বলিয়া আসিতেছেন, আধুনিক নগরের অন্যতম শর্ত পৃথক স্যানিটারি ও স্টর্ম ওয়াটার নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশে এই বাস্তবতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। দাশেরকান্দিতে বিপুল ব্যয়ে পয়োশোধনাগার নির্মিত হইলেও রাজধানীর অধিকাংশ স্যুয়ারেজ লাইন এখনো সেখানে সংযুক্ত হয় নাই। ফলে যে অবকাঠামো নদীকে রক্ষা করিবার কথা, তাহা পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহৃতই হইতেছে না।

এমতাবস্থায়, নদীদূষণের দায় কেবল ওয়াসার উপর চাপাইয়া সমস্যার সমাধান হইবে না। বিআইডব্লিউটিএর জরিপেই দেখা গিয়াছে, ব্যক্তিমালিকানাধীন ও শিল্পকারখানার ২৪৪টি বর্জ্য উৎসমুখ নিয়মিত অপরিশোধিত বর্জ্য নদীতে ফেলিতেছে। বিভিন্ন সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার ড্রেনেজ ব্যবস্থাও দূষণের উৎস। অর্থাৎ রাজধানীর নদীগুলি একটি বহুমাত্রিক প্রশাসনিক ব্যর্থতার শিকার। ফলে দায়ও হইতে হইবে সমন্বিত, সমাধানও হইতে হইবে সমন্বিত। যদিও ঢাকা ওয়াসা জরিপের তথ্যের সহিত দ্বিমত প্রকাশ করিয়াছে এবং শিল্প খাতকে প্রধান দূষণকারী বলিয়া উল্লেখ করিয়াছে; কিন্তু তথ্যগত মতভেদ সমস্যার সমাধান নহে। প্রয়োজন একটি স্বাধীন ও যৌথ কারিগরি যাচাই, যাহার ফলাফল সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকিবে। নদীদূষণের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো সংস্থার আত্মপক্ষ সমর্থন যথেষ্ট নহে। ইহার জন্য প্রয়োজন যাচাইযোগ্য তথ্য এবং তাৎপর্যপূণ অগ্রগতি।

সরকার রাজধানীর নদী রক্ষায় আন্তঃসংস্থা সমন্বয় কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছে। উদ্যোগটি ইতিবাচক। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলিতেছে, কমিটি গঠন অপেক্ষা তাহার কার্যকারিতা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কোন সংস্থা কতগুলি বর্জ্য উৎসমুখ বন্ধ করিল, কতগুলি অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হইল, কতখানি স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক শোধনাগারের সহিত যুক্ত হইল এবং নদীর পানির মান কতখানি উন্নত হইল-এই সকল তথ্য নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রকাশ করা আবশ্যক। জবাবদিহিহীন পরিকল্পনা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। ইহার সহিত শিল্পকারখানার বর্জ্য শোধনাগার কার্যকর রাখিবার বিষয়েও কোনো শৈথিল্যের অবকাশ নাই। পরিবেশ আইন সকলের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হইতে হইবে। সরকারি সংস্থা হউক কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, যাহারা নদীদূষণ করিবে, তাহাদের বিরুদ্ধে সমান কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে। পরিবেশগত ক্ষতির অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করিয়া 'পলিউটার মাস্ট পে' নীতির বাস্তব প্রয়োগও এখন সময়ের দাবি।

রাজধানীর নদীগুলি পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে আর নতুন কোনো তত্ত্বের প্রয়োজন নাই। প্রয়োজন ইতিমধ্যে চিহ্নিত সমস্যাগুলির বাস্তব সমাধান। দূষণের উৎস যখন জানা, প্রযুক্তিগত সমাধান যখন বিদ্যমান এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলিও যখন নির্ধারিত, তখন বিলম্বের কোনো যুক্তি অবশিষ্ট থাকে না। নদী রক্ষার প্রথম শর্ত নূতন প্রতিশ্রুতি নহে, বিদ্যমান দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন।